আপ রুচি খানা, এমনটা বলতে দ্বিধা হয় বইকি! যে কোনও মুহূর্তে কারও ‘খাদ্যাভাস’, প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক এমনকি প্রশাসনিক স্তরেও। সেই থেকে তৈরি উত্তেজনার আঁচ কতদূর ছড়াবে বোঝা মুশকিল। কিন্তু রমজান মাসে জাকারিয়ার ছবিটা যাবতীয় দ্বিধা কাটিয়ে দিতে পারে। ইদের হালিমে যে আদৌ হিঁদুয়ানির বাধা নেই, একটা সন্ধে জাকারিয়ায় কাটালেই টের পাওয়া যায়। রমজান মাসে এমনই এক অভিজ্ঞতার কথা শোনাচ্ছেন শুভদীপ রায়।
রোদের তেজ খানিকটা কমলেও বিকেল ফুরোয়নি। ছোট মেয়ের হাত ধরে হনহন করে সামনের দিকে এগোচ্ছেন সুবিমল বোস। দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা। ছুটির দিন মেয়েকে নিয়ে বেরিয়েছেন। আগে প্রতিবছর নিয়ম করে এখানে আসতেন। ইদানীং কাজের চাপে সময় হয় না। এবার আগেভাগে প্ল্যান করেই রেখেছিলেন। ছুটির দিন দেখে বেরিয়ে পড়েছেন, এবার অবশ্য সঙ্গী মেয়ে। তার এই প্রথমবার এখানে আসা।
হাওয়া নেই এতটুকু। প্যাচেপ্যাচে ঘাম। ভিড়ের মাঝে অস্বস্তি বাড়ছেই। সেদিকে মন দিলে চলবে না। নমাজের আগে কেনাটা সেরে ফেলতে হবে। তেলেভাজার দায়িত্ব কিশোর আদিলের। কোন গলিতে ১০ টাকার চপ ৮ টাকায় মিলবে ভালোমতো চেনে সে। হনহনিয়ে সেদিকেই পা বাড়াল।
বয়স হয়েছে, হাঁটুর ব্যথা বেশ ভোগায়। কিন্তু এই সময়টা দোকানে বসে থাকলে চলবে না। হাঁক পাড়তে হবে, আরও জোরে। একজন এলেই, আরও অনেকে আসবে। কয়েকটা বিক্রি হলেই বাড়ির জন্য কিছুটা হালুয়া নিয়ে যাবেন। এই সময়টা লাভ মন্দ হয় না, তাও আরও একটা বেশি হলে, ক্ষতি কী! এসব ভাবতে ভাবতে উঠে দাঁড়ালেন বিশ্বনাথ ঠাকুর।
আরেকটু হলেই হাত কাটত। এদিকে তাড়াহুড়ো না করে উপায় নেই! সময়ের আগে সবকিছু তৈরি করে ফেলতে হবে। তাও একা হাতে এত ফল কাটা মুখের কথা নয়। সেই কোন দুপুরে শুরু হয়েছে। বিকেল ফুরোতে চলল এখনও শেষ হওয়ার নাম নেই। এরপর শরবত বানাতে হবে, সবকিছু সাজাতে হবে, কত্ত কাজ! কতই বা আর বয়স আফরিনার, এর মধ্যেই এতকিছু করা যায়?
ধরে নেওয়া যাক, চারটে ঘটনাই কাল্পনিক। তবে এগুলোর মাঝে যে যোগসূত্র, সেটা একেবারে খাঁটি বাস্তব। চাইলেই যে কেউ এর সাক্ষী হতে পারেন। স্রেফ সময় করে রমজান মাসে জাকারিয়া স্ট্রিটে যেতে হবে। এমন আরও অনেক ঘটনাই চোখে পড়বে অনায়াসে। কারণটা আর আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। রমজান মাসে ইফতারের সময় কলকাতার যে কয়েকটা জায়গা জমজমাট হয়ে ওঠে, জাকারিয়া তার অন্যতম। বলা ভালো, সবচেয়ে বেশি পাল্লাভারী এই জায়গার। কেবলমাত্র মুঘল খানা-পিনার জন্য নয়, সম্প্রীতির মিলন-মেলা জাতীয় শব্দ এখনও অবলুপ্ত হয়নি, তা বোঝার জন্য।
সোশাল মিডিয়ার দৌলতে আলাদা করে জাকারিয়ার পথনির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ধারে বড় গেটটা দেখলেই বোঝা যায় কোন দিকে পা বাড়াতে হবে। এমনিতে এই জায়গা বেশ জমজমাট। তবে আলো পড়ে এলে লোকজনের যাতায়াত কমে। রমজান মাস তার ব্যতিক্রম। এই সময়টায় একেবারে উলটো ছবি। মানে সন্ধে হলেই ভিড় বাড়বে। আলোর চাঁদ-তারায় ঝলমলে রাস্তা। গলি ম-ম খাবারের গন্ধে। সেসব দেখতে দেখতে ধীর পায়ে এগিয়ে যাওয়া। একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়বে সুবিমল বোসের মতো কাউকে। মাঝবয়সী ভদ্রলোক মেয়েকে নিয়ে ভিড় সামলে এগিয়ে চলেছেন। কখনও ‘পেয়ারে কাবাব’, কখনও ‘শাহি টুকরা’, তাঁদের গতি মন্থর করছে। মেয়েকে দায়িত্ব নিয়ে এইসব মুঘল খানার ইতিবৃত্ত শোনাচ্ছেন সুবিমল। এঁদের দেখা হতেই পারে আদিলের সঙ্গে। বছর দশেকের খুদে, দ্রুত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। নমাজ শেষে বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার করবে সে, তাই আগেভাগে তেলেভাজা নিয়ে হাজির হতেই হবে। মাঝে পথ আটকাবেন বিশ্বনাথ। বিহারের বাসিন্দা, রমজানের সময়টা জাকারিয়ায় চলে আসেন। তাঁর অবশ্য কাপড়ের দোকান। বাহারি পোশাকের রকমফের আদিলের চোখ আটকে রাখবে বেশ খানিকক্ষণ। মনে মনে সে বেছে নেবে কোন জামাটা ইদের আগে আদায় করতে হবে। হয়তো দামে না পোষালে বাবা কিনে দেবেন না, তাও সে বলবে, আঙুল তুলে দেখাবে। এদিকে আদিলরা যেখানে বসে ইফতার সারবে, তারই পাশে আফরিনা সেই দুপুর থেকে ফল কাটছে। তারও উপোস, কিন্তু এই কাজটা না করলেই নয়।
টুকরো টুকরো দৃশ্যে ভরা জাকারিয়ায়, আরও কতশত সুবিমল, বিশ্বনাথ, আদিল বা আফিরিনা রয়েছেন তা হিসাব করে বলা কঠিন। কিন্তু রয়েছেন এতে কোনও সন্দেহ নেই। তাতে কারও অসুবিধা তো নেই, বরং আনন্দ আছে ভরপুর।
জমজমাট বোম্বে হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে মুন্না জানালেন, তাঁর দোকানে সবাই আসে। কে হিন্দু-কে মুসলিম জেনে কী হবে! তাঁর বানানো হালিম খেয়ে কে কতটা খুশি হল, সেটাই দেখার। একই বক্তব্য নাখোদা মসজিদের ঠিক সামনে দাঁড়ানো আসফাক আলমের। প্যাচপেচে গরমের সন্ধ্যায়, সবাইকে দু-দণ্ড শান্তি দেয় তাঁর তৈরি রুহ-আফজা! সে জিনিস সবাই কিনে খান। কে রোজার পর খাচ্ছে আর কে এমনিই ঘুরতে এসে খাচ্ছে, দেখার প্রয়োজন মনে করেন না আসফাক। বরং হিন্দু ক্রেতাই সংখ্যায় বেশি, এমনটা তাঁর ধারণা। কারণ চট করে রুহ-আফজার মতো খাবার তাঁরা বাড়িয়ে তৈরি করেন না। ‘শাহি-টুকরা’ আর ‘ফিরনি’র পসরা সাজিয়ে এই উপলব্ধি হয়েছে নিয়ামত খানেরও। সবাই ভালোবেসে তাঁর দোকানে খাবার কিনতে আসছেন, এটাই অনেক। ধর্ম জেনে কী হবে! মোটের উপর রমজানের জাকারিয়া যে প্রকৃত অর্থে মিলনক্ষেত্র তা সহজেই বোঝা যায়।
এ-দেশের আত্মা সম্প্রীতি। যদিও সময় সময় এমন ঘটনা ঘোটে, যাতে মনে হয় বাঁধন বুঝি ছিঁড়েছে। তবু মানুষই প্রমাণ করে, বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে কিঙ্গা রাজনৈতিক অভিসন্ধিতে মানুষকে এই সম্প্রীতির পথ থেকে সরিয়ে আনা যায় না। এখানে তাই কেউ কারও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না, গরম খাবারে মুখে ছেঁকা লাগলেও একসঙ্গে ‘কেয়া বাত’ বলতেই সবাই বেশি স্বচ্ছন্দ। গল্পের কথায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নানাভাবে ধরা দিতে পারে, কিন্তু রমজানের জাকারিয়া একেবারে বাস্তব সত্যি। সেই কবে কবীর সুমন গেয়েছিলেন, ‘পাকস্থলীতে ইসলাম নেই, নেইকো হিন্দুয়ানি… তাতে যাহা জল তাহা পানি।’ রমজানের জাকারিয়ায় যেন সে পঙক্তিই ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, আর যেন বলে, খাবারের থেকে বড় ধর্ম আর নেই। জীবনে আসলে বাঁধা এই পাকস্থলীতেই।