রমজানের দিনে যে কোনও বিরিয়ানির দোকানের দিকে তাকালেই একটা দৃশ্য কমন। প্রমাণ সাইজের হাঁড়ি। লাল-শালুতে মোড়া। সেসব দোকানের পাশ দিয়ে গেলে, বিরিয়ানি গন্ধ যে কোনও প্রকারে খাদ্যরসিকদের নাকে ঢুকে পড়বেই। কিন্তু আজ বিরিয়ানি নয়, হাঁড়ির গল্প শোনা যাক। কলকাতার সমস্ত বিরিয়ানির হাঁড়ির খবর যে-দোকান জানে, তাদের গল্প। লিখছেন শুভদীপ রায়।
আজ রমজান, আজ বিরিয়ানি-দিন। যদিও ইউটিউব-করিয়ে ফুড ভ্লগারদের জেরে, বিরিয়ানি এখন সারা বছরই ‘সুপারহিট’। কেউ কেউ বিরক্ত ও ক্লান্তও বোধ করছেন নিশ্চয়ই। গত দু’-তিন বছরে, বিরিয়ানির কত দোকান খুলেছে পশ্চিমবঙ্গে– এ নিয়ে একটা গবেষণা হলে মন্দ হত না। এত কিছুর পরও, আজ এই উৎসবমুখর দিনে বিরিয়ানির একটা বাড়বাড়ন্ত লেগেই থাকে। কলকাতার নামী-দামি ঝাঁ-চকচকে দোকান হোক বা ফুটপাথের ছোট দোকান– মোটামুটি যে কোনও বিরিয়ানির দোকানের দিকে তাকালেই একটা দৃশ্য কমন। প্রমাণ সাইজের হাঁড়ি। লাল-শালুতে মোড়া। সেসব দোকানের পাশ দিয়ে গেলে, বিরিয়ানি গন্ধ যে কোনও প্রকারে খাদ্যরসিকদের নাকে ঢুকে পড়বেই। এবং মনেও হয়তো পড়বে, হলুদ-সাদা বিরিয়ানির ভেতর চিকেন-মাটন-আলু-ডিম নানা উপাদান! দু’কদম পেরনো মাত্র সে অবশ হয়ে অনেক সময়ই হাজির হবে দোকানে।
যদিও আজ বিরিয়ানি নয়, হাঁড়ির গল্প শোনা যাক। কলকাতার সমস্ত বিরিয়ানির হাঁড়ির খবর যে-দোকান জানে, তাদের গল্প।
রমজান মাসে জাকারিয়ায় খাবার ছাড়া তেমন কিছু চোখে পড়ে না। তাও কয়েক গণ্ডা কালো মাথা, ঝলমলে পোশাক, আতরের শিশি আর মেঝেতে পাতার মাদুর তালিকায় রাখা যেতে পারে। সেই ভিড়ে ব্যতিক্রম ‘নিউ মোরাদাবাদি স্টোর’। আলাদা করে নজর কাড়বে, দোকানের সামনে রাখা দুটো বড় হাঁড়ি। বিরিয়ানির দোকানের বাইরে লাল কাপড়ে মোড়া যে হাঁড়ি থাকে– ঠিক সেইরকম। দোকানের দিকে চোখ রাখলে অবশ্য অন্য অনেক কিছু চোখে পড়বে। আতরদানি থেকে পিতলের হাঁড়ি, বাহারি পানপাত্র থেকে পিতলের তাজমহল– এই দোকানে সব আছে। তবে সেসবের জন্য এর পরিচিতি নয়। আসল পরিচিতি ওই বাইরে রাখা হাঁড়ির জন্য। ঠিক ধরেছেন, এই দোকানেই বিক্রি হয় বিরিয়ানির হাঁড়ি! তবে আর পাঁচটা দোকানের সঙ্গে মোরাদাবাদি স্টোরকে গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে। তার কারণ এই দোকানের বয়স। দীর্ঘ ১৩৫ বছর ধরে বিরিয়ানির হাঁড়ি বিক্রি করছে এই দোকান। স্বাভাবিক ভাবেই কলকাতার নামজাদা সব বিরিয়ানির দোকানেই এই দোকানেরই হাঁড়ি রয়েছে। গর্বের সঙ্গে সে কথা বলেন দোকানের পুরনো কর্মীরা।
বিরিয়ানির হাঁড়ি
এঁদের মধ্যে বয়সে, অভিজ্ঞতায় এগিয়ে শামসের আলি। বিরিয়ানির হাঁড়ি আর এই দোকানের বিশেষত্ব নিয়ে তিনি বেশ সচেতন। কলকাতায় তখন ঘোড়ায় টানা গাড়ি শুরু হয়েছে। যে রাস্তার ধারে দোকান, সেখানেও নিয়মিত ব্রিটিশ সাহেবদের যাতায়াত ছিল। মোড়ে মোড়ে বিরিয়ানি, সে সময় কল্পনাতেও আসত না কারও! হাতে গোনা কিছু দোকান আর সম্ভ্রান্ত মুসলিম কিছু পরিবারের দরকার পড়ত বিরিয়ানির হাঁড়ি। সকলেরই একমাত্র পছন্দ ছিল এই মোরাদাবাদি স্টোর। এখানেই মেলে সম্পূর্ণ তামার হাঁড়ি, যা বিরিয়ানির স্বাদ আরও বাড়িয়ে দেয়। খরচ বাঁচাতে অনেকে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতেও বিরিয়ানি রাঁধেন, তবে তার স্বাদ ও মান তেমন ভালো হয় না। অন্তত শামসের আলির বক্তব্য সেটাই।
দোকানে রয়েছে আরও অনেক সামগ্রী
বড় হাঁড়ির তুলনায় ছোট হাঁড়ির দাম কম। বিশেষত্ব বলতে, চওড়া মুখ আর তলার দিকটা ভারি। এই হাঁড়িতে বিরিয়ানি ছাড়া আর কিছু রান্না করলে সমস্যা। কারণ দীর্ঘক্ষণ খাবার গরম রাখার যে কারিগরি পদ্ধতি এতে রয়েছে, তা পোলাও বা ভাত রান্নার জন্য নেই। ঢাকনাতেও রয়েছে বিশেষত্ব। একেবারে মাপে মাপে হয় না এই ঢাকনা, বরং আকারে সামান্য এদিক-ওদিক। আসলে, দম-বিরিয়ানি তৈরির সময় এই ঢাকনা ময়দা বা আটা দিয়ে বেশ শক্ত করে আটকে দেওয়া হয় বিরিয়ানির হাঁড়িতে। ঢাকনার আকার একটু এদিক-ওদিক হলে খোলার সুবিধা। বিরিয়ানি যতই অভিজাত খানা হোক, আসলে জিনিসটি তৈরি হয়েছিল গরিব শ্রমিকদের খাওয়ার জন্যই। তাই এক হাঁড়িতে একসঙ্গে অনেকের রান্না করা যাবে– এই ভাবনা প্রথম থেকেই ছিল। হাঁড়ির দৈতাকৃতির জন্যও সেই ভাবনাই দায়ী।
বিরিয়ানির হাঁড়ির এই বিশেষত্ব সম্পর্কে বুঝতে, একটু ইতিহাস ঝালিয়ে নেওয়া যেতেই পারে। তখন লখনউয়ের বড়া ইমামবড়া তৈরির কাজ চলছে। দিনরাত এক করে পরিশ্রম করছেন প্রায় হাজার ২০ নির্মাণ শ্রমিক। তাঁদের ভরপেট খাবার তো চাই! তাই এরকম একটি খাবারের পরিকল্পনা করা হল, যেখানে চাল-মাংস-সবজি একসঙ্গেই থাকবে। খাবারটি রাঁধা হবে দম-কুকিং স্টাইলে। ধীরে ধীরে যখন সেই রান্না হত, তখন সুগন্ধে ভরে যেত চারিদিক। একদিন কাজ পরিদর্শনে এসে নবাবও পেলেন সেই ঘ্রাণ। কৌতূহলী হয়ে তিনি এ ব্যাপারে তত্ত্বতালাশও করলেন। আর তারপরই বিরিয়ানির এন্ট্রি হল নবাবের বাবুর্চিখানায়। রান্নার ধরন যদিও একেবারে বদলায়নি। তখনও বড় হাঁড়িতেই তৈরি হত বিরিয়ানি, এখনও হয়।
হাঁড়ির প্রসঙ্গ বাদ দিলেও মোরাদাবাদি স্টোর নিয়ে অনেক কিছু বলা যায়। দোকানেই ঢুকলেই চোখে পড়বে বিশেষ কিছু যন্ত্র। প্রতিটা যন্ত্রের নানা রকম কাজ। কোনওটা ডাল বা মশলা পিষতে, কোনওটা সিমাই তৈরিতে, কোনওটা আবার মাংসের কিমা বানানোর জন্য। আজকের দিনে মিক্সার গ্রাইন্ডারে এই ধরনের সব কাজই করে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু তাতে নাকি খাবারের আসল স্বাদটা উবে যায়। তাই বড় বড় দোকান তো বটেই, সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারেও চিরাচরিত এইসব যন্ত্র রাখা হয়। এছাড়া রয়েছে হুঁকো! পুরনো দিনের সিনেমায় জনপ্রিয় এই তামাক সেবনের যন্ত্রটি বেশ চোখে পড়ে। আজকের দুনিয়ায় তার অস্তিত্ব নেই। কিন্তু এই দোকানে বহাল তবিয়তে রয়েছে বেশ কয়েকটা হুঁকো। দোকানির দাবি, এখনও কেউ কেউ এ জিনিস কিনে নিয়ে যান। কাঠের হুঁকো তো বটেই, রয়েছে পিতলের হুঁকো। সেসবের দাম ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তবে এ জিনিসও নাকি বিক্রি হয়।
পিতলের তৈরি ঘোড়া
নজর কাড়ে পিতলের তৈরি বিভিন্ন পশুপাখির মূর্তি। বাঘ, ঘোড়া, সারস, হাতি– সব আছে। দোকানের আলোয় সেসব ঝলমল করে। তবু যেন সব আলো কেড়ে নেয় বাইরে থাকা ওই বড় বড় দুটো হাঁড়ি। কিছুদিনের মধ্যে ওগুলোর ঠিকানা হবে কলকাতার কোনও নামজাদা দোকানে। সেই দোকানের হাঁড়ির খবর আগেভাগেই যেন সাজিয়ে রেখেছে মোরাদাবাদি স্টোর।