সব মসজিদের তলাতেই কি মন্দির আছে! বাজে কথা। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় না। তবু অনেকে এমন ভাবে বলে, শুনতে শুনতে কেমন যেন কানে ভোঁ ভোঁ লেগে যায়।
বিরিয়ানি তো বনতা হ্যায়!
ছুটি-ছুটি সোমবার আদতে অষ্টম আশ্চর্য। এ পৃথিবী বহু কষ্টেসৃষ্টে তাকে পায় যখন একবার, তখন হাত পেতে নিয়ে চেটেপুটে নেওয়াই দস্তুর। আকাশ অংশত মেঘলা। গরমেরও বোধহয় আজ হলিডে। সকালে পাড়া ক্রিকেট। সন্ধেয় আইপিএল। খাবার দেওয়ার কুইক-সার্ভিস অ্যাপের হোম পেজটা চমৎকার সাজিয়েছে। প্লেটের ছবির পাশে সুন্দর জাফরিকাটা নকশা। নকশার ভিতর শাহি খাবার। ‘স্পেশাল ডিসকাউন্ট ২০০ অফ’, ‘৬০% ফ্ল্যাট ডিসকাউন্ট’– সবই বেশ কায়দা করে লেখা। অন্য রকম। আরবি স্টাইল সম্ভবত। আরবি স্টাইল কাকে বলে? ধারণা নেই। ব্যাপারটা মুসলমানী, এটুকুই জানি।
দিনের গায়েও চাঁদ উঠেছে। মুসলমানী রেওয়াজ। সূর্যের মুখ ঢাকা। চাঁদের বাড়বাড়ন্ত। বড় বড় কোম্পানি শহর জুড়ে ব্যানার টাঙিয়েছে। সোনার চাঁদ, রূপোর চাঁদ। ঝলমল করছে। হ্রস্ব ই-র মাথা চাঁদ। দীর্ঘ ঈ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিদায় নিয়েছে নতুন বানানবিধিতে। ই-ঈ এখনও বসে খায় ক্ষীর খই। এটুকুই সহজপাঠ। ফিরনি কই? থাকতে কি পারত না! ই-ঈ মাথায় চাঁদ নিয়ে বসে ইফতার করতে পারত এক মাস। এসব হয় না। সবটাই খানিক ভাসা ভাসা। অজানার মাঝে জানার সন্ধান। হাতে পড়ে পাওয়া চার আনাও থাকে না। তবে, দ-এ দাওয়াত চেনা। ও-এ ওরা। ও-এ ওদের। উ-এ উৎসব কি-না সন্দেহ। রাস্তা বড্ড আটকে আটকে থাকে। যে সব মসজিদে বড় করে জমায়েত হয়, সেরকমই একটির পাশে গত ক’দিন যাবৎ অনেক পুলিশ। বাস আস্তে চলে। জ্যাম হয়। মাইকে কে একজন কাঁদছেন! কে কাঁদছেন, কেন কাঁদছেন জানা নেই। তাঁর কান্না হাওয়ায় মিশে মিশে গেলে কথা বলতে অস্বস্তি হয় সকলেরই, বাস মসজিদ পেরিয়ে যেতে থাকে ধীরে।
:আরও শুনুন:
ইদের স্বাদ বাড়ায় বাকরখানি, যে খাবারে মিশেছে প্রেমের করুণ কাহিনিও
মসজিদে ঢুকে কখনও দেখা হয়নি কে কাঁদে, কোথায় বসে কাঁদে। সব মসজিদের তলাতেই কি মন্দির আছে! বাজে কথা। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় না। তবু অনেকে এমন ভাবে বলে, শুনতে শুনতে কেমন যেন কানে ভোঁ ভোঁ লেগে যায়। পৃথ্বীরাজ হেরে গেলেন। বারো শতকের শেষ দিক। মহম্মদ ঘোরির হাতে মুসলমান শাসন দৃঢ় হল। এবার মসজিদ নির্মাণের পর্ব। ইসলামিক রীতি কে জানে তখন! কারিগর, স্থপতি তো বেশিরভাগই হিন্দু। তাঁদের হাতেই গড়ে উঠতে লাগল মসজিদ। আর স্পষ্টতই মসজিদের স্থাপত্যে মিশে মিশে গেল হিন্দু স্থাপত্যশৈলী। মন্দিরশৈলীর অনেক চিহ্ন মসজিদের গায়ে। বাংলায় আবার আর এক রকমের ব্যাপার। দিল্লির তদানীন্তন ইসলাম শাসনের সঙ্গে এখানকার শাসনের অনেক প্রভেদ। এখানে সুলতানরা অনেক বেশি স্বাধীন। মসজিদ বা সৌধ বানানোয় তাই চালাশৈলী গ্রহণ করতেও তাঁরা দ্বিধা করেননি। ইসলামি বা হিন্দু রীতি ভাবার আগেও, সম্ভবত তাঁরা বাংলার রীতিকে প্রাধান্য দিতে চেয়েছিলেন বেশি। বাংলার মানুষের সঙ্গে বাঁধা পড়তে চেয়েছিলেন শিল্পের ভাষায়। হিন্দু স্থপতিরা তাঁদের যাবতীয় অভিজ্ঞতা দিয়ে যে সব মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, শিল্পের ভাষায় সেখানে ধর্ম নিয়ে টানাটানি পড়েনি। যা কিছু হিন্দু-চিহ্ন সব হাতে হাতে ফিরি হয়ে গেছে। থেকেও গেছে। সে নাহয় হল! শিল্পে-শিল্পে বেশ মেলামেশা। তা বলে ভাঙার ইতিহাস কি মিথ্যে, ওই জিজ্ঞাসে কোন জন! কোন ইতিহাস? কত রকম ইতিহাস! সব ঘুলিয়ে যায়। কে যেন কানের কাছে এসে বলে বলে যায়, মসজিদের নিচে মন্দিরই আছে। এটা যদি ঝাঁকি হয়, ওটা তো তাহলে বাকি! আর এইসব সাত-পাঁচ ভাঙা ভাবনার কাচে লেগে বিক্ষত হয়ে ফেরে কান্নার সুর। ঈশ্বরের কাছে মানুষের কান্না। পবিত্র। মসজিদ ফেলে এসেও কথা বলতে ইচ্ছে করে না অনেকক্ষণ।
:আরও শুনুন:
ইদের হালিমে বাধা নেই হিঁদুয়ানির, রমজানের জাকারিয়া যেন মিলন-মেলা
তবে, মসজিদ-ই-জটিলতায় বহুক্ষণ কাটানো মুশকিল। তার থেকে বিরিয়ানিতে ফেরা ভালো। নইলে তো আবার জানতে হবে যে, ‘রিয়াক’, ‘কিবলা’ কী! ‘মিহরাব’, ‘খুতবা’ এসব শব্দ মিডিয়ায় বিশেষ শোনা যায় না। যেন মসজিদের অন্দর নেই। মসজিদ কি শুধু ধর্মীয় প্রার্থনার জায়গা! মন্ত্রণা সভা, ছাত্রাবাসের মতো সামাজিক কাজও নাকি জড়িয়ে মসজিদ-সংস্কৃতিতে। দূরে দূরে ঘুরে বেড়ায় কথাগুলো। চেনা বলতে, নমাজ আর মাইক। ফতোয়া। ন্যাড়া মাথা সোনু নিগম। চেনা বলতে ওই ‘উজু’। জ্ঞানবাপী বিতর্কে বহুবার শোনা গিয়েছিল। জল। প্রার্থনার আগে জলস্পর্শ। হিন্দুদেরও রীতি। জলে আচমনের পর মন্ত্রোচ্চারণ। জল প্রাণ। জল, প্রাণকে ঊর্ধ্বে তুলে নিয়ে যায়, কল্যাণ করে। বেদ তাই জলকে বলে, উতলা মা। সেই জল স্পর্শের রীতিতে মন্দির-মসজিদ এক। এভাবে মিলিয়ে মিলিয়ে দেখলে হয়তো অপরিচয়ের দূরত্ব এতখানি থাকে না। শঙ্খবাবু বলেছিলেন বটে, একেবারে পড়ুয়াবেলায় এক সম্প্রদায় যদি অন্য সম্প্রদায়ের নিবিড় পরিচয়ে আসতে পারে তাহলে বিভেদের পলেস্তারা গোড়াতেই খসে যায়। কিন্তু কে মেলাবে! রাজনীতি শুধু ‘ইফতার’ করে, আর ‘দাওয়াত’ পায়।
:আরও শুনুন:
ইশারায় ইদের চাঁদ দেখাচ্ছেন কৃষ্ণ! ভাইরাল ছবিতে কি সত্যিই সম্প্রীতির বার্তা?
অতএব, ম-এ মোবারক। শুভেচ্ছাও লেখা যায়। তবে, মুবারক বা মোবারক ট্রেন্ডি। যেমন, জিবলি। তা দিয়ে বাবরি-ভাঙা-উল্লাস ফিরিয়ে আনা যায়। শিল্পের সীমারেখা নিয়ে তর্ক করা যায়। তর্কে থাকাটাই বড় কথা। মোবারক লিখলে পরধর্মসহিষ্ণু মান্য হয়। যত মত তত পথ। তবু চোখ রাঙায় বাংলাদেশ। কী রবীন্দ্রবিদ্বেষ! কী অবস্থা! কী অবস্থা? এপারে ওপারে মিলিয়ে দেখেছে নাকি কেউ! না দেখুক, তবু ভয় হয়। এপারে ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ। বিদ্বেষ নেই তাঁর প্রতি। বিদ্বেষ আছে নিজেদের প্রতি। খবরে যা দেখায় না তা দেখায় সোশ্যাল মিডিয়া। কী অবস্থা! সব বাংলাদেশ হয়ে যাবে না তো! ভয় ভয় চাঁদ। তবু, ম-এ মোবারক। ট্রেন্ডি। ‘শাহি’, ‘তওফিক’ ইত্যাদি প্রভৃতি। সকাল থেকে চরকিপাক খাচ্ছে রাজনীতি। হিসাব মেলাতে। হিসাব মিলে যায় ভোটের বাক্সে। মানুষ মেলে না।
ই-এ তবু আজ ইদ। ওদের ইদ। সোমবার, ছুটি আজ। বিরিয়ানি তো বনতা হ্যায়!