প্রাচীন এথেন্স শহরে, এলাকার ধনী ব্যক্তিকে বাধ্য করা হত সার্বজনীন পুজো-পার্বণের আর্থিক দায়ভারটুকু নিতে। কেউ চাইলেই নিজের অধিকৃত অর্থ যত খুশি বাড়িয়ে যেতে পারতেন না। তাহলে সাম্য সংরক্ষণের এমন সুচারু নিয়মটি ঘেঁটে গেল ঠিক কোন সময় থেকে?
সাম্য কী অলীক কল্পনা! নাকি অসাম্যের ব্যবধান কমাতে কমাতে একদিন ঠিক কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছনো সম্ভব! এ প্রশ্ন নিয়েই যে কত তত্ত্ব, কত তথ্য তার ইয়ত্তা নেই। তবু এই যে এত লুঠতরাজ, হিংসা-বিদ্বেষ, অন্যকে পিছিয়ে দিয়ে নিজে এগিয়ে যাওয়ার অক্লান্ত ইঁদুরদৌড়, সে সব থমকে দেওয়া সম্ভব, যদি কেবলমাত্র সামাজিক স্তরে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা যায়। এমন বিশ্বাস আজও মানুষ করে থাকেন। স্বপ্ন দেখেন এমন এক সমাজের যেখানে, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ঘুচবে। ফসলের মতোই সমস্ত সুযোগসুবিধার সুষম বন্টন হবে। ফলে কারোর মধ্যেই আর অন্যকে আঘাত করবার প্রবণতা কিংবা যেনতেনপ্রকারেণ নিজেকে উপরে টেনে তুলবার খিদে থাকবে না। যত অসম্ভব-ই হোক না কোন, এমন এক সমাজের স্বপ্ন আজও মানুষকে ঘিরে থাকে। তবে বৈষম্যের পাথর যেন ঠেলে সরানোই যায় না।
ফলত প্রশ্ন থেকেই যায় যে, বাস্তবিকভাবে কি কখনওই আর্থিক বৈষম্য ঘুচিয়ে দেওয়া সম্ভব? বেশিরভাগ মানুষই হয়তো এর উত্তরে এক বাক্যে ‘না’ বলবেন। তবে গোড়ায় এই অসাম্য ঠিক কেমন ছিল, তা যাচাই করতে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘দ্য গ্লোবাল ডাইন্যামিক্স্ অফ ইনইকোয়ালিটি’ নামের একটি প্রোজেক্ট। এর উদ্দেশ্য ছিল, আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার একাংশে অবস্থিত ৫০,০০০টিরও বেশি প্রাচীন বাড়ির গঠন বিচার করে, প্রায় ১০,০০০ বছর আগেকার আর্থ-সামাজিক অবস্থার জরিপ করা। যুগে যুগে আর্থিক বৈষম্য কীভাবে প্রভাবিত করেছে বাড়িগুলোর গঠন, তাই-ই ছিল বিচার্য। আর এই কাজেই এমন কিছু তথ্য উঠে এসেছে, যা দু’দণ্ড হলেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে মানুষকে।
গবেষকেরা দেখেছেন যে, প্রাচীনকালে বহু সামাজিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল এমনভাবেই, যাতে ধনী ব্যক্তি চাইলেই তাঁর ধনরাশি যত খুশি বাড়াতে পারতেন না। যেমন প্রাচীন এথেন্স শহরে, এলাকার ধনী ব্যক্তিকে বাধ্য করা হত সর্বজনীন পুজো-পার্বণের আর্থিক দায়ভারটুকু নিতে। এ ছাড়াও শহরের কোনও ‘পাব্লিক’ ইমারতের পরিকাঠামোগত বদল করতে হলেও সেখানে খরচ করার দায়িত্ব থাকত এই ধনীদেরই। অন্য আর একটি সভ্যতায় আবার ধনী ব্যক্তিদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত টাকা ভাগ করে দেওয়া হত সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষদের মধ্যে। দাসপ্রথা যাতে কোনওভাবেই মাথাচাড়া না দিতে পারে, সে জন্য দরিদ্র মানুষের ঋণ অবধি মকুব করে দেওয়া হত। এ কিন্তু কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনার উদাহরণ নয়। সে সময়কার সমাজের নিয়ন্ত্রণকারীরা রীতিমতো বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিতেন এইসব বিষয়ে।
তাহলে সাম্যের এমন সুচারু নিয়মটি উবে গেল ঠিক কোন সময় থেকে? অনেকে মনে করেন, মানুষ কৃষিকাজে মন দেওয়ার পর আচমকা বিপুল সম্পত্তির মালিকানা লাভ করে, যা থেকে বৈষম্যের সূচনা। কিন্তু ইতিহাস বলছে অন্যরকম কথা। গবেষকেরা দাবি করছেন, নিয়ম কখনওই নিজে থেকে মিলিয়ে যায়নি, বরং তা ইচ্ছাকৃত ভাবেই এলোমেলো করে দেওয়া হয়েছে। আর তা সযত্নে করেছে কিছু ক্ষমতালোভী মানুষের দল। তাঁরা সংখ্যায় বেশি হোক বা কম, কেন্দ্রীভূত ধনরাশি অধিকারের চকচকে প্রলোভন এড়িয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা তাঁদের মোটেও আকৃষ্ট করেনি।
অর্থাৎ, বর্তমানে যে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য দেখে আমরা ভাবি যে এমনটাই চিরাচরিত, সাম্য স্থাপনের স্বপ্ন আদতে অসম্ভব, তা নয়। বরং এই অসাম্যের সমাজ পুরোপুরি মানুষের হাতে তৈরি। চেষ্টা করলে সাম্যবাদকে বাস্তবায়িত করা অসম্ভব কোনও কাজ নয়। আজ যে সামাজিক বৈষম্য ধনী-গরীবের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে, নানা রকম অসামাজিক কাজকর্মকে উৎসাহ দিচ্ছে, তা চাইলে হয়তো দূর করা সম্ভব। কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যে যাতে সাম্যের সেই ধারণা যাতে ছড়িয়ে না পারে, সে জন্য ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরাই ইন্ধন দিচ্ছেন। আর মানুষও তাতে চোখ-কান বুজে শামিল হচ্ছে, পরোক্ষে ঠেকিয়ে রাখছে আদত সাম্যের ধারণাকে। অন্তত ‘দ্য গ্লোবাল ডাইন্যামিক্স্ অফ ইনইকোয়ালিটি’ প্রোজেক্ট সে ইশারাই করছে!
তাহলে কি আগামীতে সাম্যের কাছে কখনও পৌঁছবে মানুষ? বোঝাই যাচ্ছে, তা নির্ভর করছে মানুষের সদিচ্ছার উপরেই।