বাজারের হিসাবে চোস্ত। এদিকে পরীক্ষার খাতায় ডাহা ফেল! একজন নয়, এমন অবস্থা অনেকের। সম্প্রতি ভারতীয় খুদেদের উপর চালানো এক গবেষণায় মিলেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঠিক কেন এমন অবস্থা তাদের? আসুন শুনে নেওয়া যাক।
পেঁয়াজ ৩০, আলু ১৬, টোম্যাটো এক কিলো নিলে ২০ টাকা। মটরশুঁটির একদাম ৩০ টাকা কিলো…সামনে দাঁড়ালেই গড়গড়িয়ে সবজির দাম শোনাতে শুরু করবে রাজু। ক্রেতা খানিক ভেবেচিন্তে বলবেন, ৩ কিলো আলু, ৫০০ মটরশুঁটি, ১ কিলো টম্যাটো, ৩০০ পিঁয়াজ। এরপর ওজন করে গুছিয়ে দিতে যেটুকু সময় লাগে। থলিতে জিনিস ভরতে ভরতে রাজুর সপাট উত্তর, ৯২ টাকা। ৫০০ টাকার নোট দিলেও নো চিন্তা! ৪ টে একশো টাকার নোট আর একটা ১০ টাকা ধরিয়ে রাজু বলবে, ২ টাকা কম নিলুম। হিসাবের জন্য আলাদা সময় প্রয়োজন নেই। বড় নোট হাতে নিয়ে টাকা ফেরত দিতেও ভাবতে হয় না বিশেষ। কিন্তু এই রাজুই অঙ্ক পরীক্ষায় ৬ পেয়েছে। ১০০-র মধ্যে মাত্র ৬। তাও আবার ক্লাস ৬-এ। শুনতে অবাক লাগছে? বাস্তবে এমনটাই হচ্ছে।
:আরও শুনুন:
অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল এক্সিট পোল! দিল্লির নির্বাচনে এমনটাই বারবার হয়?
আবার, একইভাবে ৫০০ টাকা হাতে ধরিয়ে বাজারে পাঠানো হল সাত্যকিকে। আনতে হবে টুকিটাকি কয়েকটা জিনিস। বাজারের দামের হিসাবে খুব বেশি হলে ১৫০ টাকা খরচ হবে। সাত্যকিও ক্লাস সিক্সের পড়ুয়া। পরীক্ষায় একশোয় একশো পেয়েছে অঙ্ক আর বিজ্ঞানে। কিন্তু বাজারের হিসাবে সে এক্কেবারে ডাহা ফেল। একে তো মাঝরাস্তায় কী কী আনতে বলা হয়েছে সেসব ভুলে গেল। তারওপর বেশি দাম দিয়ে জিনিস কিনে ঠকল। শুধু তাই নয়, আধঘণ্টা ভেবেও মেলাতে পারল না হিসাব। দোকানি যা ফেরত দিয়েছে, তার খালি মনে হচ্ছে সেটা বেশি! অথচ এমন কিছুই বাস্তবে হয়নি। রোদে পুড়ে, বাড়ি ফিরে একেবারে নাজেহাল অবস্থা তার।
:আরও শুনুন:
‘বড় হয়ে মন্দির ভাঙবে এমন ছাত্র চাই না!’ নার্সারি পড়ুয়াকে সাসপেন্ড যোগীরাজ্যের স্কুলের
দুই ক্ষেত্রেই চরিত্র কাল্পনিক। তবে এমন হাজারও রাজু আর সাত্যকিরা আমাদের চারপাশে রয়েছে। একই বয়সের দুই পড়ুয়া, একজনের ধ্যান জ্ঞান বলতে পড়াশোনা, গান-বাজনা, খেলাধুলা এইসব। আরেকজন কোন বাজারে কত ভোরে উঠে কাঁচামাল কিনলে একটু সস্তা হবে, সেই ভাবনায় ব্যস্ত। পড়াশোনা সেও করে, তবে ওটা গৌণ, ব্যবসাটাই মুখ্য। উপায়ই বা কী! বাড়িতে ওই কটা টাকা বাড়তি রোজগার হয় বলেই না রোজ দুধ খেতে পায় ছোট্ট বোনটা। কিংবা ঠাকুমার ওষুধ দরকার হলেও ওই টাকাতেই হাত পড়ে। এ দেশে এমন ছবি বেশ চেনাশোনা। কিন্তু যা অচেনা তা হল এই দুই ধরনের পড়ুয়ার ভাবনাচিন্তা। দুজনেই অঙ্কে তুখোড় তবে একজন পরীক্ষার খাতায় অন্যজন বাস্তবের মাটিতে। কোনটার প্রয়োজন বেশি? তা তর্কের বিষয়। তবে দুই ক্ষেত্রেই কেন সমান ফল নয়, তা নিয়ে ভাবা যেতেই পারে। অঙ্ক মানেই তো সংখ্যার খেলা। সেখানে কে কীভাবে হিসাব করছে সেটা বড় কথা হওয়ার নয়। কিন্তু বাস্তবে তাই হচ্ছে। যে স্কুল আর বাড়ির গণ্ডি টপকে বাস্তবে দুনিয়ায় কখনও পা রাখেনি, সে সামান্য হিসাব করতেই ভুল করছে। আবার যার ঘরবাড়ি ওই বাজার দোকান, সে সামান্য যোগ-বিয়োগেও ভুল করছে, যদি সেটা পরীক্ষার হলে বসে করতে হয়। এমনকি ক্লাসঘরের শান্ত পরিবেশেও যদি রাজু ও তার দলবলকে অঙ্ক করতে বলা হয়, তাতেও নিট ফল সেই শূণ্য।

সম্প্রতি দেশজুড়ে এই নিয়ে গবেষণা চালিয়েছিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দোপাধ্যায়। তাঁর সহকারী হিসেবে আরও অনেক গণ্যমান্য অধ্যাপকরা ছিলেন। কলকাতা, দিল্লি সহ বিভিন্ন জায়গার পড়ুয়াদের মধ্যে সমীক্ষা চালানো হয়। এদের মধ্যে বাইরে গিয়ে কাজ করে এমন পড়ুয়াও ছিল অনেকেই। কেউ ছোটখাটো ব্যবসা, কেউ বাবার দোকানে বসে, কেউ আবার অন্য কোনও মালিকের অধীনে কাজ করে। স্কুলে ভরতি হওয়া স্রেফ মিড ডে মিলের জন্য। তাও রোজ সুযোগ হয় না যাওয়ার। পরীক্ষার সময় কোনওক্রমে স্কুলে ঢোকা। তাও ঘণ্টা পড়ার অনেক আগেই খাতা জমা দিয়ে চম্পট। অথচ একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, খাতায় যা অঙ্ক দেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে ঢের বেশি কঠিন হিসাব সে মুখে মুখে করতে পারে। একইভাবে যে পড়ুয়া মন দিয়ে খাতায় সব অঙ্ক করে তাক লাগিয়ে দিল, সে সামান্য যোগ-বিয়োগে ভুল করছে, পরীক্ষার হলের বাইরে। সমস্যা তো বটেই, কিন্তু তার সমাধান কোথায়?
:আরও শুনুন:
কোটা আন্দোলনে শহিদ, পরীক্ষা হলে ‘ফুল’ হয়ে সহপাঠীদের পাশে বাংলাদেশের ছাত্র
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমনটা হওয়ার কারণ ট্রান্সফার লার্নিং-এর অভাব। অর্থাৎ এক জায়গা থেকে শেখা জ্ঞান অন্য জায়গায় প্রয়োগ করতে না পারা। পাঠ্যক্রম এমন হওয়া উচিত যা পড়ুয়াদের নতুন কিছু শেখাবে, এবং তারা যা জানে সেটাকেও উৎসাহ দেবে। অস্বীকারের উপায় নেই, সিলেবাস তৈরিও করা হয় এই ভাবনা থেকেই। তবু বাস্তবে কোথাও যেন খাদ থেকে যাচ্ছে। আর তাই অঙ্ক জানা সত্ত্বেও কোথায় তা প্রয়োগ করতে হবে, সেটা বুঝে উঠতে পারছে না রাজু বা সাত্যকির মতো খুদেরা। এছাড়া সামাজিক বৈষম্য তো রয়েইছে! যে যাই বলুক, এখনও এ দেশে ভালো জায়গায় চান্স পেতে গেলে দরকার হয় ব্যাগভর্তী নাম্বার। সেই নাম্বার দেখিয়েই মিলবে ডিগ্রী। আর ডিগ্রী দেখিয়ে চাকরি। বাস্তব অভিজ্ঞতা যাই হোক, রেজাল্টে দামী ইউনিভার্সিটির ছাপ থাকলে মাইনের প্যাকেজও সেইমতো হবে। তারপরের কথা পরে ভাবা যাবে। কে কতদিন কোথায় টিকতে পারল, সেই খোঁজ খুব একটা কেউ রাখে না। তাই ডিগ্রী বাড়িয়ে চাকরি পাওয়ার লক্ষ্যেই দৌড়াচ্ছে সবাই। আর পিছনে দাঁড়িয়ে হিসাব কষে যাচ্ছে রাজুরা। ভুল হলে নাম্বার কাটা যাবে না ঠিকই, কিন্তু ক্ষতি হবে। যে ক্ষতি পরেরদিন বোনের জন্য দুধ না জোগাতে পারে। তাই ভুল করেও হিসাবে ভুল হয় না ওদের।