এই প্রজন্ম তাঁদের নিজের মাতামত জানাচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে। সবসময় যে লিখছেন তা নয়। অন্যের মতামত শেয়ার করেও বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তাঁরা কোন পক্ষে। অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়া একাধারে ক্লাসরুম আবার সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের মঞ্চও।
কাশ্মীরে ভয়াবহ জঙ্গি হানা থেকে পরিবেশ আন্দোলন। জেগে থাকা রাতে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে নিয়ত মাথা ঘামাচ্ছেন তরুণ প্রজন্ম। যাঁদের পোশাকি নাম জেন জি। অনেকেই মনে করতে পারেন, তাঁরা হয়তো বিনোদনে মন ঢেলে দিয়েছেন। বাস্তবিক তা নয়। তাঁরা যতখানি বিনোদনে মন দিয়েছেন, ততটাই রাজনৈতিক বিষয়ে সচেতন। দেশ-কাল ও বৈশ্বিক ঘটনা সম্পর্কে তাঁরা এতটাই ওযাকিবহাল যে, তাঁদের ‘ওক জেনারেশন’ আখ্যা দেওয়া হয়। এই সচেতনতার সঙ্গে সঙ্গেই আর একটা প্রশ্নও চলে আসে, যে প্রজন্ম এতখানি সচেতন সে প্রজন্ম কি তাহলে অ্যাকটিভিজমে বা পথে নামায় সেভাবে আগ্রহী নয়? এখানেই খতিয়ে দেখা যেতে পারে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা।
তরুণ প্রজন্মের এই সচেতনতার অনেকটা প্রতিফলন দেখা যায় সোশ্যাল মিডিয়াতেই। এক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্তত দুরকম ভূমিকা নেয়। এক, নানা বিষয়ে তথ্য ও মতামত নবীন প্রজন্মের সামনে চলে আসছে এই মাধ্যম মারফত। এমন একটা স্পেস, যেখানে বহু মতের মানুষ একসঙ্গে থাকেন। যদি ‘পাড়া’ ধরা হয়, তাহলে এটি সেই পাড়া, যেখানে বহু বিষয় নিয়ে চর্চাকারীরা একত্রে থাকেন। ফলে, কোথায় কী ঘটছে, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে জরুরি অবস্থান নেওয়া উচিত, তা দ্রুত সামনে চলে আসে। দ্বিতীয় ভূমিকা হল, এই প্রজন্ম তাঁদের নিজের মাতামত জানাচ্ছেন এই মাধ্যমেই। সবসময় যে লিখছেন তা নয়। অন্যের মতামত শেয়ার করেও বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তাঁরা কোন পক্ষে। অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়া একাধারে ক্লাসরুম আবার সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের মঞ্চও। জেন জি নিজেদের অবস্থান ও ভাবনা বোঝাতে পারছে সহজেই। কিন্তু এই অবস্থান বুঝিয়ে দিতে পারছেন বলেই কি তাঁরা সচেতন ভাবে আর কোনও অ্যাকটিভিজমে অংশ নিচ্ছেন না! যদিও সামগ্রিকভাবে সকলের ক্ষেত্রে এ-কথা বলা যায় না, তবু এই খটকা থেকেই যায়।
খেয়াল করে দেখার মতো যে, এই জেন জি যে কেবল তথ্য জেনে ক্ষান্ত হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। সোশ্যাল মিডিয়া ঘেঁটেই, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে তাঁরা বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করছেন। আরও জানার চেষ্টা করছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে নজর রাখলে দেখা যাবে, যে কোনও বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যার বহু ভিডিও বা কন্টেন্ট তৈরি করা হচ্ছে। তা মূলত, এই জেন জি-র চাহিদা পূরণ করতেই। অর্থাৎ এই প্রজন্ম যে ওয়াকিবহাল এবং রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তাঁরা ভোট আর রাজনীতিকে এক অঙ্কে মিলিয়ে দেখেন না। সমস্ত রাজনৈতিক বক্তব্যই যে ভোটমুখী হবে, এমনটাও মনে করেন না। অনেক সময় নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষপাতী হয়েও যে থাকতে হবে, এমন মতেও বিশ্বাস করে না। তবে বাস্তবের মাটিতে তাঁদের পদক্ষেপ হয়তো একটু কমই। অর্থাৎ সমসময়কে তাঁরা যতটা পর্যবেক্ষণ করেন, ততটা হয়তো সামাজিক পরিবর্তনে তাঁদের বাস্তবিক কাজ দেখা যায় না। এই প্রবণতা নতুন অভিযোগের কাঠগড়ায় এনেই যেন দাঁড় করিয়েছে জেন জি-কে। মনে করা হচ্ছে, এই প্রজন্মের সচেতনতা অনেকটাই বেশি। তবে নানা মত, নানা রাজনৈতিক দলাদলিতে তাঁরা বোধহয় ক্লান্ত। তাই তাঁদের অবস্থান জানাচ্ছেন, মতামত জানাচ্ছেন, কিন্তু যেভাবে অ্যাকটিভিজমে ঝাঁপ দেওয়া উচিত, তা হয়তো তাঁরা করে উঠতে পারছেন না। এই পরিসরেই বদলে যাচ্ছে সময়, বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
তাহলে এই রাজনৈতি সচেতনতা কি আদতে অর্থহীন? এমনটা এক কথায় বলা যায় না। হয়তো সোশ্যাল মিডিয়া মতামত ও অবস্থান জানানোকেই জেন জি প্রাথমিক অ্যাকটিভিজম বলে মনে করছে। তবে তা যে নতুন পথের হদিশ খুঁজে পাবে না, তার কোনও মানে নেই। কেননা রাজনৈতিক সচেতনতাই প্রজন্মকে নতুন ভাবনার দিকে এগিয়ে দেয়। সেদিক থেকে রাজনৈতিকভাবে ওয়াকিবহাল এই প্রজন্ম যে পরিবর্তনে ভূমিকা নেবে না, তা নয়। হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ার সহজ পথে ক্লান্তি এলেই, ক্লান্তি ভুলে নতুন করে পথে নামবে নতুন প্রজন্ম, জেন জি। অন্তত তাঁদের সচেতনার দিকে তাকিয়ে সেই আশা করা বাহুল্য কিছু নয়।