ধুলোয় ঢাকা শহর। ব্যস্ত রাস্তা। ট্রাফিক জ্যাম। এসব ছাপিয়ে যায় রঙের গন্ধ। শুধু বসন্ত নয়, বারোমাস। রঙে ভরা জীবন। রুটিনের অঙ্গ খাতা-তুলি-পেনসিল। তাঁদের বসন্ত যাপন বুঝি আলাদা কিছু? সেই খোঁজ নিতেই ‘জি সি লাহা’য় পা রাখা। শতাব্দী প্রাচীন দোকান। বছরভর শিল্পীর ক্যানভাস রঙিন করাই কাজ। তাদের বসন্ত কি আলাদা কিছু? কতটা রঙিন? জানালেন দোকানের বর্তমান কর্ণধার সিদ্ধার্থ লাহা। খোঁজ নিলেন শুভদীপ রায়। ছবি ব্রতীন কুণ্ডু।
হিসেব করে সালটা বলতে হবে। তাও গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পেরিয়েছে। কলকাতার ব্যস্ত রাস্তা। সন্ধে হব হব। সবেমাত্র ট্রামলাইন পেরোলেন, তেঢ্যাঙা এক ভদ্রলোক। ঢেউ চুল। গায়ের রং চাপা। সবকিছু ছাপিয়ে যায় গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর। দোকানে যাতায়াত রয়েছে, তবু ভিতরে ঢুকে মাথা নামানোর রীতি ভুলে যান। অগত্যা মাথা গিয়ে ঠেকেছে দোকানের মাঝে ঝুলতে থাকা হ্যাজাক লণ্ঠনে। অবাক হয়ে সেই দৃশ্য দেখছেন এক কিশোর- সিদ্ধার্থ লাহা। তেঢ্যাঙ্গা ভদ্রলোকের নাম সত্যজিৎ রায়।
একই জায়গায় সকাল সকাল বেশ ভিড় জমেছে। ভিড়ের মাঝে এক ভদ্রলোক। ভিড়ের উপলক্ষও তিনিই। ঝাঁপ বন্ধ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, এবং বাকীরা তাঁর জন্য। দোকান খুললে তিনি ভিতরে যাবেন, একাই। সব জিনিস গুছিয়ে নেবেন, তাও একাই। তারপর দোকানে সাজিয়ে রাখা অটোগ্রাফ খাতা তুলে একটার পর একটা সই করে যাবেন। এই দৃশ্যও অবাক হয়ে দেখছেন এক কিশোর- সিদ্ধার্থ লাহা। আর যাঁকে ঘিরে এমন ভিড়, তিনি মকবুল ফিদা হুসেন।
এমনই আরও কতশত ঘটনার সাক্ষী ওই কিশোর। বর্তমানে অবশ্য তিনি প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। ধর্মতলার অনতিদূরে জি সি লাহা, সেই দোকানের কর্ণধার ইনি। কথায় কথায় শোনালেন দোকানের গল্প। একে একে উঠে এল, সত্যজিৎ রায়, মকবুল ফিদা হুসেন, বিকাশ ভট্টাচার্য কিংবা গণেশ পাইনের মতো শিল্পীদের প্রসঙ্গ।
মার্চের বিকেল। চাঁদিফাটা গরম। বাইরে টেকা দায়। ভিতরটা বেশ আরামের। শরীরের তো বটেই, চোখেরও। ধুলোয় ঢাকা যে ধূসর শহরে কষ্ট করে সূর্য দেখতে হয়, এখানে অনায়াসে সেই সুখ মেলে। বরং তার চেয়েও বেশি কিছু। রঙিন। তাকালে অস্বস্তি নয়, প্রশান্তি মেলে। একটু এগোলেই ব্যারিকেড। ওপারে বাকি অংশ। অনেকটা আদালতের মতো ধাঁচ। মধ্যিখানে একটা টেবিল। ওপ্রান্তে কাঁচা-পাকা দাড়ির প্রৌঢ়। বোঝাই যায়, দোকানের কর্ণধার। চারপাশে ভীষণ ব্যস্ততা। ব্যারিকেডের এপারেও, ওপারেও। ভাবা যায়, ঠিক এইখানে একসময় এসে দাঁড়িয়েছেন সত্যজিৎ রায়, মকবুল ফিদা হুসেন, বিকাশ ভট্টাচার্য কিংবা গণেশ পাইনের মতো শিল্পীরা। হয়তো সাদাকালো মেঝেয় তাঁরা পা রাখেননি। হয়তো দোকানের মাঝে ঝুলতে থাকা একমাত্র হ্যাজাক লণ্ঠনে তাঁদের কারও মাথা ঠেকে যেত। তবে এই জায়গায়, ঠিক এই জায়গায় তাঁরা এসে দাঁড়িয়েছেন। অনেকক্ষণ। চারিদিকে তাকিয়ে খুঁজেছেন। কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা দেখে এগিয়ে গিয়েছেন। আরও কত কী…
শুধুমাত্র রঙ-তুলির দোকান ভাবলে চলবে না। ধর্মতলার অনতিদূরে জি সি লাহা, ইতিহাসের জীবন্ত দলিলও বটে। বয়স ১২০। অন্তত হিসাব তাই বলছে। ১৯০৫ সালে গিরীন্দ্র লাহার তৈরি এই দোকানের বর্তমান কর্ণধার সিদ্ধার্থ লাহা। বয়স তাঁরও এমন কিছু কম নয়। কিশোর বয়সে সত্যজিৎ রায়কে সামনে থেকে দেখেছেন। এই দোকানেই। পুরনো স্মৃতি হাতড়েই বললেন, ‘রায়বাবু দাঁড়ালে উঁচুতে ঝুলতে থাকা হ্যাজাক তাঁর মাথায় ঠেকত’! কিশোর বয়সের স্মৃতি এতটুকুই মনে আছে। এছাড়া মনে আছে, রায় সাহেবের বিশেষ এক অভ্যাসের কথা। জানালেন, যে কোনও জায়গায় সই করতেন না সত্যজিৎ রায়। তাঁর জন্য আলাদা করে অটোগ্রাফ খাতা রাখতে হত দোকানে। সেও অবশ্য রায়সাহেবের নির্দেশেই। শুধু তাই নয়, খুদে ভক্তদের সই উপহার দেওয়ার সময় বিভিন্ন রঙের কলম ব্যবহার করতেন সত্যজিৎ। অবশ্য প্রায় একই অভ্যাস ছিল, শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের। তিনিও নতুন অটোগ্রাফ খাতা ছাড়া কাউকে সই উপহার দিতেন না। তিনি আবার নিজে হাতে জিনিস বেছে নিতে পছন্দ করতেন। দোকানের কর্মীরা নয়, তিনিই ভিতরে ঢুকে যা প্রয়োজন বের করে আনতেন। এমন শিল্পী যাঁদের গোটা দেশের মানুষ মান্য করেন, তাঁরা এই ধর্মতলার দোকানে এসে নিজে হাতে জিনিস বেছে নিচ্ছেন এমনটা তখনও বেশ অবাক করার মতো বিষয় ছিল। তবে কলকাতার বুকে এমনটা প্রায়শই হত। সামনে থেকে সেইসব দৃশ্যের সাক্ষী থাকতেন সিদ্ধার্থ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
রং-তুলি নিয়েই এই পরিবারের দিনযাপন। বাড়িতেও সেই পরিবেশ ধরা পড়ে। সিদ্ধার্থ নিজেই জানালেন, এখনও তাঁদের সংগ্রহে এমন কিছু ছবি রয়েছে, যা অমূল্য। বিশেষ করে হেমেন মজুমদারের আঁকা একটি ছবি। সিদ্ধার্থ জানালেন, ছবিটি তাঁর ঠাকুমার। কম বয়সে গত হয়েছিলেন। তাঁরই একটি লাইফসাইজ পোট্রেট হেমেন মজুমদারের মতো শিল্পী এঁকেছিলেন। উপহার হিসেবে পাওয়া সেই ছবি, এখনও যত্নে রেখেছে লাহা পরিবার। এমনই আরও কতশত ছবি পারিবারিক সংগ্রহে রয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই! পারিবারিক ব্যবসা অবশ্য অন্য রঙের। সেই রং জামাকাপড় রঙিন করতে ব্যবহার হয়। একসময় এই রং দিয়েই নাকি দোল খেলতেন তাঁরা। রং উঠতে অন্তত কয়েক সপ্তাহ লেগে যেত। এখন আর সে বালাই নেই। আবীরের ছোঁয়ায় স্নিগ্ধ দোল যাপনে ছোটবেলা সেইভাবে খুঁজে পান না সিদ্ধার্থ। তাই আলাদা করে দোল যাপন নিয়ে বিশেষ কিছু বলেননি। কথা প্রসঙ্গে বর্তমান শিল্পীদের কথাও বললেন। জানালেন, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদল এসেছে। আজকাল আর বড় শিল্পীরা দোকানে আসেন না। ফোনে অর্ডার করে দেন, তা পৌঁছে যায়। ধর্মতলার এই দোকান ছাড়া আর কোনও শাখা নেই এঁদের। তবে সারা ভারতেই রং বা রঙের সামগ্রী পৌঁছে দেন এঁরা। ডিজিটাল যুগ রং তুলির বিক্রি কিছুটা হলেও কমেছে। তাতে আক্ষেপ থাকলেও প্রকাশ করেননি সিদ্ধার্থ। বরং এতদিন যে বদলের সাক্ষী থেকেছে তাঁদের পরিবার, পারিবারিক ব্যবসা, আগামীতেও তা চলবে নিজের ছন্দে এমনটাই মনে করেন।