ভাণ্ডারে তার বিবিধ রতন। কচুরি, লস্যি আরও কত কী! আর সেই গরম কচুরির টানেই এসে দাঁড়িয়েছিলেন খোদ অমিতাভ বচ্চন। কেমন ছিল সেদিনের অভিজ্ঞতা? শতবর্ষে পা-দেওয়া মোহন ভাণ্ডারের অন্দরে পৌঁছে খোঁজ নিলেন শুভদীপ রায়।
মুখে কথা সরছে না। এসে দাঁড়িয়েছেন একজন (Amitabh Bachchan)। শহর কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে দোকান। দিনভর হরবখত হাজারও মানুষের ভিড়। সকলেরই চাহিদা গরম গরম কচুরি। তা ক্রেতাদের মনচুরি করতে শুধু স্বাদের বাহার থাকলে তো চলে না। হাতের সঙ্গে সমানে কথাও বলে যেতে হয়। সে-কাজে দড় দোকানের মালিক। কর্মচারীরাও কম যান না। অথচ সেদিন কারও মুখে কথা নেই। এদিকে সামনে দাঁড়িয়ে ক্রেতা (Amitabh Bachchan)।

আর কথা সরবেই বা কী করে! ক্রেতা যে স্বয়ং অমিতাভ বচ্চন (Amitabh Bachchan)।
না, একেবারে আচম্বিতে তিনি যে এসে দাঁড়িয়েছেন তা নয়। তবে সংবিৎ ফিরতে বেশ কয়েক লহমা সময় নিয়েছিলেন মোহন ভাণ্ডারের মালিক বিকাশ জয়সওয়াল। আগে থেকে বলা-কওয়া ছিল। ‘পিকু’ সিনেমার শ্যুটিং। যে চরিত্রে অভিনয় করছেন বিগ বি, তিনি প্রবাসী বাঙালি। নিজের শহরে ফিরে প্রিয় কচুরির দোকানে গিয়েছেন। তবে ততক্ষণে সিনেমা আর বাস্তব যেন মিলেমিশে একাকার। খোদ বিগ বি (Amitabh Bachchan)দোকানিকে জিজ্ঞেস করছেন ‘গরম হবে?’ এতদিনের চেনা প্রশ্ন। তিনি যে আসবেন জানা কথা। তবু সেদিন চোখের সামনে মানুষটিকে দেখে সত্যিই কথা বলতে পারেননি কেউ। সম্মতিতে শুধু ঘাড় নেড়েছিলেন বিকাশ।

দেখতে দেখতে সে ঘটনার পর প্রায় কেটে গিয়েছে এক দশক। ধর্মতলার মোহন ভাণ্ডার পা দিয়েছে শতবর্ষে। একশো বছরের পথচলায় অগণন উজ্জ্বল মুহূর্ত। তবে, উজ্জ্বলতর বোধহয় বিগ বি-র (Amitabh Bachchan) এসে দাঁড়ানোর মুহূর্তটিই। সেই দৃশ্যের ছবি আজও দোকানের দেওয়ালে টাঙানো। আছে আরও নানা ছবি। এমনকী শ্যুটিং সংক্রান্ত রিপোর্টাজও যত্ন করে ল্যামিনেট করে রাখা আছে। আর এই এগারো বছরের মাথায় সেদিনের কথা বলতে গেলে এখনও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বিকাশের মুখ। এই ২০২৫-এ এসেও তাঁর কাছে টাটকা এ মুহূর্ত। হাসতে হাসতে বললেন, সেদিন সেই মুহূর্তে তিনি নাকি একটা কথাও বলতে পারেননি। বরং লস্যি যিনি বানান, সেই বিশ্বজিৎ বিশাই কথা বলেছিলেন বিগ বি-র (Amitabh Bachchan)সঙ্গে। দিনভর চলেছিল শুটিং। এতদিন আগের কথা। তবু কথা বলতে বলতে তাঁর মনে হয়, এই তো সেদিন।

এমনিতেই এ দোকান বেশ চালু। দোকানের আয়ু-ই এর সাক্ষ্য দিচ্ছে। তবে গত এক দশকে সিনেমার দৌলতে জনপ্রিয়তা বেড়েছে অনেকখানি। বর্তমানে দোকানের দায়িত্ব সামলান বিকাশ জয়সওয়াল-ই। পারিবারিক ব্যবসা। তিনি চতুর্থ প্রজন্ম। সুদূর এলাহাবাদ থেকে কলকাতা এসেছিল তাঁর পূর্বপুরুষ। শহরের বুকে এত পুরনো দোকান হাতেগোনাই ক’টাই রয়েছে, তাও আবার কচুরির! তবে এই দোকানের সবচেয়ে জনপ্রিয় হল লঙ্কার আচার। কচুরি বা শিঙাড়া নিলে যা বিনামূল্যেই দেওয়া হয়। সেইসঙ্গে লস্যি বা গরম চা-ও রয়েছে। এমনিতে রাস্তার ধারে দোকান হওয়ার সুবাদে ভিড় লেগেই থাকে। কিন্তু পাশেই একইরকম কচুরির দোকান। তাই কখনও ক্রেতাদের হাঁক পেড়ে ডাকতে হয়। তাতে গলা মেলান খোদ বিকাশও। তবে সেদিনটা ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী। সেদিনের মতো এদিনও দোকানে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন ছোটখাটো চেহারার বিশ্বজিৎ।

লস্যি, দইবড়া, কুলফি বা কোনও মিষ্টি সাজিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর। টেবিলে পৌঁছে দেন অন্য কেউ। তবে হাসিমুখে সবটা গুছিয়ে দেন তিনি। জানালেন, সেদিন অমিতাভ বচ্চন (Amitabh Bachchan)তাঁর কাছেই প্রথম প্রশ্নটা করেছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন, ‘এই কচুরি তিনি খেতে পারেন কি না?’ কেন এমন প্রশ্ন তা বোঝেননি বিশ্বজিৎ। এতবড় অভিনেতার ডায়েটে আদৌ কচুরি থাকে কি না, সেসব তাঁর জানা ছিল না। তবে সেদিন একবারও না ভেবে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিলেন। সেই গল্প এখনও বলে বেড়ান সবাইকে। মেদিনীপুরে গ্রামের বাড়ি। সেখানে ফিরেও সবাইকে গল্প শুনিয়েছিলেন বচ্চন-দর্শনের। এখনও কেউ জানতে চাইলে একইরকম উত্তেজনায় গল্প করতে বসেন।

যদিও ১০০ বছরের ইতিহাসে স্রেফ এই একটা ঘটনাই হয়েছে তা নয়। শুরুর দিকে কলকাতার বাবু-জমিদারদের আনাগোনা ছিল এই দোকানে। ব্রিটিশরাও নাকি ঢুঁ মারতেন। আসলে, দোকানটা এমন একটা জায়গায়, যেখানে বিভিন্ন পেশার মানুষজনের ভিড় হওয়াটাই স্বাভাবিক। কাছেই কলকাতা কর্পোরেশনের অফিস, একটু এগোলেই নিউ মার্কেট, এদিকে ধর্মতলা। পিছন দিকে কয়েক পা হেঁটে চাঁদনি চক, সবমিলিয়ে জমজমাট জায়গা। দোকানের মেন্যুতে বিশেষ বদল আনা হয়নি এই ১০০ বছরে। প্রথম থেকেই কচুরি তরকারি আর মিষ্টির জন্য এই দোকানের পরিচিতি। তবে দামের ফারাক হয়েছে অনেকটাই। একসময় ১টাকা ২৫ পয়সা দাম ছিল কচুরির, এখন সেটাই ৫০ টাকা প্লেট। তাতে থাকবে চারটে কচুরি, আলুর তরকার, মিষ্টি চাটনি আর লঙ্কার আচার।

দাম বেশি মনে হলেও কচুরির স্বাদ সেই আক্ষেপের জায়গা রাখবে না। খেলে শরীর খারাপের সম্ভাবনাও কম। বোঝাই যায় ভালো মানের তেল এবং পরিষ্কার জায়গা তৈরি। চাইলেই দোকানে ঢুকে রান্নার জায়গা ঘুরে দেখা যায়। অবশ্য মান ভালো না হলে যে অমিতাভ (Amitabh Bachchan)এই দোকানে খেতে আসতেন না তা বলাই যায়! যতই শুটিং-এর অংশ হোক, এতবড় অভিনেতা যে দোকানের কচুরি খাবেন তার স্বাদ, গন্ধ, মান ভালো না হলে চলে নাকি!