তারা ঘটক। প্রেমের ঋত্বিক। দূত কিংবা দূতি। পদাবলি তাঁদের ছাড়া অসম্পূর্ণ। বৃন্দাবন কদমের গন্ধে নেশা-নেশা। তবে যুগলমিলনের পর তাঁদের আর কে মনে রাখে! প্রেমের যাবতীয় স্থানীয় সংবাদে তাঁরাই বিশেষ সংবাদদাতা। চিঠি চালাচালিতে বিশ্বস্ত। কিশোরী ফ্রক কিংবা ডাকাবুকো হাফপ্যান্ট। তারপর একদিন দাদা-দিদি হাত ধরে সিঁড়িতেই বসে পড়ে। আর বেচারা ঘটক কাটা ঘুড়ি। আটকে পড়ে স্মৃতির শুকনো ডালে। আজ প্রেমের দিনে তাদেরই ফিরে দেখার পালা।
প্রেমের ঘটকালি নিয়ে লিখলেন, শৌনক দত্ত।
যে সময়ের গল্প আজ বলব ভাবছি, সেটা নয়ের দশক। আজকের দিনের মতোন হাতে হাতে মোবাইল নেই, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ নেই, প্রেম-ভালবাসা তখনও ‘সবিনয় নিবেদন’। আমাদের ঘিরে রাখে ‘শেষের কবিতা’, ‘দেবদাস’, ‘চানঘরে গান’। নীরা, বেলা বোস আর নীলাঞ্জনার প্রেম। এই সময়ে বসে সেই দিনগুলোর কাছে ফিরে যেতে যেতে দেখি, কৈশোর পেরিয়ে সদ্য যৌবনে পা দেওয়া আমি কোচবিহারে; আমাদের ঘিরে আছে জেনকিন্স, সুনীতি। আড্ডামুখর সন্ধ্যা, সাগরদিঘি, ঠোঁটে কুমার শানু, অলকা ইয়াগনিক, বুকে রোমান্স ও বিরহের চিনচিন। চোখের তারায় ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’, ‘পেয়ার তো হোনা হি থা’, ‘কুচ কুচ হোতা হ্যায়’, শাহরুখ ও কাজল। ‘তুঝে ইয়াদ না মেরি আয়ে’ গানে গলা ছেড়ে দিয়ে চোখের জল! বুক ধুকপুক কাকে যেন বলতে ইচ্ছে করে, ‘ঝিন্টি, তুই বৃষ্টি হতে পারতিস!’
এই দিনগুলোর অনেক গল্প গড়গড় করে বলে ফেলা যায়, বলে ফেলা যায় অয়নের কথা, লিলি কটেজের সিনহা বা রানিবাগানের বুচু ও নন্দের গল্প। সবগুলো গল্পের সঙ্গে আমি আর সিনহা মিলেমিশে একাকার। কারণ প্রেমপত্র আমাকেই লিখেতে হতো। আর সেই পত্র কীভাবে কখন দেওয়া হবে তার পরিকল্পনা করত সিনহা। সমর্পিতা, অয়ন্তিকা কিংবা দেবশ্রী, জিনিয়ারা কোথায় আছে কেমন আছে জানি না, আজকে বরং অয়ন্তিকা আর ভবতোষের গল্প বলি।
ম্যাগাজিন রোডের লিলি কটেজ, তার দোতলা ঘরের সকাল-দুপুর জুড়ে তখন প্রেম-প্রেম গন্ধ। টিউশন জুড়ে পড়ার চেয়ে প্রেমের গুঞ্জন, এ তার প্রেমে তো সে তাহাদের প্রেমে। প্রতিদিন এর জন্য তার জন্য চিঠি লিখছি, নয়তো কীভাবে প্রোপোজ করবে তা নিয়ে কথা বলছি।
ক’দিন ধরে এই শহরে তুমুল বর্ষা, সাগরদিঘির আড্ডা বন্ধ, ত্রিকাল ধেয়ে বৃষ্টি নামছে। অশ্বিনী বাবুর ব্যাচ থেকে ভিজতে ভিজতে ফিরছি, বন্ধু ভিক্টরের জন্য একটা প্রেমপত্র লিখে রেখেছি গত সপ্তাহে, মেয়েটিকে আমি চিনি না বলে আজও দেওয়া হয়নি। কিন্তু ভিক্টর বৃষ্টি শুরুর আগের দিন কদমতলার মোড়ে যে রেশনের দোকান সেখানে দুজন মেয়েকে দেখিয়ে বলেছিল, ওই মেয়েটিকে চিঠিটা দিতে হবে, পারবি? এক পলক তাকিয়ে খেয়ালে বলেছিলাম, হ্যাঁ, পারব।
সমর্পিতার রিকশার পিছন পিছন সাইকেলে ভিজছে সিনহা। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমাকে তখন ঘিরে ধরেছে অয়ন্তিকার জন্য ক’দিন আগে ভবতোষের হাউমাউ কান্না। কল্লোল ও মিতালির প্রেম তখন জমে ক্ষীর, সৌম্য আর মোনালিসার প্রেম রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের মতোন শুরু হয়েছে। বুচুর জড়তা কিছুতেই কাটানো যাচ্ছে না। স্কুল ছুটির পরে সুনীতির সামনে চালতাতলায় গিয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করতে করতে যখনই সে নন্দকে আসতে দেখে, তখনই দৌড়ে পালায়। সিনহা রিকশার পিছন পিছন অনেকটা এগিয়ে গেছে। পঞ্চরঙ্গীর মোড়ে বন্ধ দত্ত এন্ড সন্স দোকানের বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে থাকা ভিক্টরের দেখানো সেই মেয়েটাকে দেখতে পেলাম। চিঠিটা আমার ব্যাগেই আছে। তাই ভাবলাম এই একা দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগটা কাজে লাগাই।
– তুমি নিশ্চয়ই দেবস্মিতা?
– কেন?
মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, এতসব কোটেশন ব্যবহার করে লেখা চিঠিটা এই মেয়ের জন্য একদম বেখাপ্পা। সমবয়সী মেয়েদের মতোন নয় , কেমন যেন রুক্ষ!
– না, আসলে তোমার জন্য একটা চিঠি ছিল।
– আমার জন্য চিঠি?
সিনহা আমায় পাগলের মতো ডাকছে সেই চিৎকার বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে ভেসে আসছে। আমি শুকনো প্যান্টের কোমরে হাতটা মুছে ব্যাগের ভেতর থেকে চিঠিটা বের করে কোনরকমে হাতে গুঁজে দিয়েই সজোরে প্যাডেল মারলাম। রাসমেলার মাঠ পেরিয়ে মনে হলো ভিক্টরের নামটাই তো বলা হয়নি দেবস্মিতাকে।
আজ ছয়দিন একই ধারায় চলছে বৃষ্টি। আমরা সাগরদিঘির পাড়ে ডিএম অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছি। ভিক্টর এখনো চিঠির উত্তর পায়নি। মেয়েটি দেবজ্যোতিবাবুর ব্যাচে জয়েন করেছে সেই নিয়ে গল্প চলছে। হঠাৎ দেখলাম বাবা আসছে এই দিকে, বন্ধুদের রেখে ছাতা নিয়ে এগিয়ে গেলাম বাবার কাছে। বাবার কাছাকাছি যেতেই বিস্ময়ে খেয়াল করলাম দেবস্মিতা বাবার পাশে ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে।
-আজকাল বেশ ভাল প্রেমপত্র লিখছিস? বাবার গলার স্বর শুনে বুঝতে পারলাম দেবস্মিতা বিচার দিয়েছে কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না আমার বাবাকে কীভাবে দেবস্মিতা খুঁজে বের করল।
-আমি লিখিনি।
-তোর হাতের লেখা তো আমি চিনি নাকি?
-থাক দাদা, বকবেন না। চিঠিটা বোধ করি ওর না অন্য কারও জন্য লিখেছে। শোনো, তোমার হাতের লেখা সুন্দর, ভাষার ব্যবহার চমৎকার বন্ধুর জন্য চিঠি না লিখে সাহিত্য লেখো, ভাল করবে।
আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। চুপচাপ বাবার বকা শুনছি। বাবাকে বুঝিয়ে শান্ত করে দেবস্মিতা যখন বাবার সঙ্গে ফিরে গেল তখন ভিক্টর, সিনহা এসে পাশে দাঁড়ায়।
-তোর বাবা আর দেবারতি আন্টি কেন এসেছিল রে? – ভিক্টর জিজ্ঞাসা করে
-কে দেবারতি আন্টি? আমি বিস্ময়ে বলি ভিক্টরকে।
-তোর বাবার কলিগ দেবস্মিতার মা তোর সঙ্গে কথা বলছিল যিনি।!
সন্ধ্যার প্রগাঢ় বর্ষা অদ্ভুত এক ভৈরব ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে। আর আমার ভীষণ হাসি পায়।