শেষ দশ বছর সময়কেই যদি ধরা হয়, দেখা যাবে এমন বেশ কিছু সিনেমা হয়েছে বলিউডে, যেগুলো সাধারণ কমার্শিয়াল সিনেমা হলেও সেখানে রীতিমত গুরুত্ব পেয়েছে নারীচরিত্রেরা। তাদের দুঃখ, বেদনা, গোপন চাহিদা সবটুকুকেই সমানভাবে আলোয় আনা হয়েছে। আর এ কথা বললে ভুল হয় না যে, বলিউডের মহিলা চিত্রনাট্যকারদের (Bollywood Women Screenwriters)হাতেই সৃষ্টি হয়েছে হিন্দি সিনেমার সেরা নারী চরিত্রেরা। তাদের হৃদয়ের সাদা-কালো-ধূসর নির্বিশেষে সমস্তটা দর্শকের সামনে তুলে ধরা হয়েছে সযত্নে।
যা কিছু জমজমাট, চোখ ধাঁধানো, নায়কোচিত – মূলধারার সিনেমা তার সবটুকু তুলে রেখেছে নায়কদের জন্য। পুরুষ চরিত্রেরা ভিলেনের সঙ্গে মারপিট করেছে, সীমানা পার করে গুপ্তচর হিসেবে অন্য দেশে পা রেখেছে, রাগের মাথায় হ্যান্ডপাম্প উপড়ে তুলে নিয়েছে, কখনও বা নিকটজনের হত্যার বদলা নিয়েছে একাই। নায়িকারা থেকে গিয়েছে একপাশে। নায়ককে ভালোবাসা বাদে, খলনায়কের অত্যাচারের শিকার হওয়া ছাড়া, মূলধারার বলিউডি সিনেমা বিশেষ কিছু করতে দেয়নি তাকে। তবে সে অন্ধকারেও কিছু জোনাকি থেকেই গিয়েছে। একটু খুঁজলে মেইনস্ট্রিম হিন্দি সিনেমাতেই পাওয়া যায় বেশ কিছু নারী চরিত্র, যাদের চিত্রায়ন করা হয়েছে সময় নিয়ে। তাঁদের নারীসুলভ ঠুনকো আবেগও কতখানি সঙ্গত, তাই যত্ন নিয়ে দেখিয়েছেন চিত্রনাট্যকার।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী দিব্যা দত্ত বলেন, “নারীকেন্দ্রিক সিনেমা হয়তো বরাবরই কমবেশি হয়ে এসেছে। কিন্তু এমন সমস্ত সিনেমাকে আলাদা করে ‘নায়িকাকেন্দ্রিক’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রতিবার। অথচ ‘নায়ককেন্দ্রিক’ বলে কখনোই কোনও সিনেমাকে চিহ্নিত করা হয় না!” যেন প্রছন্নভাবেই মেনে নেওয়া হয় যে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের অন্য সমস্ত ক্ষেত্রের মতোই সিনেমাতেও অগ্রাধিকার নায়কেরই।
এই ধারা অবশ্য অনেকখানি ভাঙতে দেখা গিয়েছে সাম্প্রতিককালে। শেষ দশ বছর সময়কেই যদি ধরা হয়, দেখা যাবে এমন বেশ কিছু সিনেমা হয়েছে বলিউডে, যেগুলো সাধারণ কমার্শিয়াল সিনেমা হলেও সেখানে রীতিমত গুরুত্ব পেয়েছে নারীচরিত্রেরা। তাদের দুঃখ, বেদনা, গোপন চাহিদা সবটুকুকেই সমানভাবে আলোয় আনা হয়েছে। আর এ কথা বললে ভুল হয় না যে, বলিউডের মহিলা চিত্রনাট্যকারদের (Bollywood Women Screenwriters) হাতেই সৃষ্টি হয়েছে হিন্দি সিনেমার সেরা কয়েকটি নারী চরিত্র। তাদের হৃদয়ের সাদা-কালো-ধূসর নির্বিশেষে সমস্তটা দর্শকের সামনে তুলে ধরা হয়েছে সযত্নে।
‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখা’ সিনেমাতে লেখিকা-নির্দেশিকা অলংকৃতা শ্রীবাস্তব অন্যান্য কয়েকটি মহিলা চরিত্রের মধ্যে জায়গা দিয়েছেন ‘ঊষা বুয়াজী’কেও। সংসারের চাপে ক্লান্ত স্বামীহারা এই নারী গোপনে ইরোটিক পাল্প ফিকশন পড়েন। অল্পবয়সী এক সাঁতার প্রশিক্ষকের সঙ্গে যৌন প্রেমালাপেও জড়িয়ে পড়েন এক সময়ে।
‘ইংলিশ ভিংলিশ’ সিনেমায় গৌরি শিন্ডের লেখা শশী চরিত্রটি আপ্রাণ খুঁজে বেড়ায় আত্মপরিচয়। বিদেশ পাড়ি দিয়ে পোশাক নয়, বরং ভোল পালটে যায় তাঁর ভাবনাচিন্তার। হীনমন্যতার অতল থেকে উঠে শশীর নিজেকে খুঁজে পাওয়ার যাত্রাই দেখতে হয় মুগ্ধ হয়ে। ‘ডিয়ার জিন্দেগি’ তথা সেখানের মুখ্য চরিত্র কিয়ারাকেও যত্ন নিয়ে লিখেছেন গৌরি শিন্ডে। আপাতভাবে অস্থিরচিত্ত কিয়ারা ভোগে গভীর অবসাদে। বিষণ্ণতা কাটাতে এক সময়ে মনোবিদের কাছে যায়। নতুন পুরুষের প্রেমেও পড়ে।
জোয়া আখতার ও রিমা কাগতি নির্মিত ‘দিল ধড়কনে দো’ সিনেমায় প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে দেখা যায় আয়েশা চরিত্রে। উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে আয়েশা মুখ বুজে সহ্য করে তার স্বামীর ভঙ্গুর ‘মেল ইগো’। পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে নিজেকে নিঃস্ব হয়ে যেতে দেয়। শেষ পর্যন্ত যদিও কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করেই সকলের সামনে পছন্দের পুরুষকে সে অপেক্ষা করতে বলে তার ফিরে আসার। চিত্রনাট্যকার ভবানী আইয়ারের লেখা ‘রাজি’ সিনেমায় সেহমত চরিত্রটি দেশের জন্য প্রাণ বাজি রেখে সীমান্ত পাড়ি দেয়। বিয়ের পর তার বিদায় সংগীত একাকার হয়ে যায় দেশত্যাগের যন্ত্রণার সঙ্গে।
যেন কেউ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ পুরুষ চরিত্রদের মুখোমুখি দাঁড়াতে, রোজকার জীবনের সাধারণ নারীরাই যথেষ্ট। তাদের চাওয়া-পাওয়ার সবটুকু নৈতিকতার পরিমাপকে হয়তো সঙ্গত বলে গণ্য করা যায় না। কিন্তু তা দিনের আলোর মতো সত্যি। আর নায়কের মা-বোন হয়ে পাশে দাঁড়ানোর বদলে, মানুষ হিসেবে কতখানি দেওয়ার রয়েছে তাদের, তা হয়তো একজন মহিলা চিত্রনাট্যকারের চাইতে বেশি ভালো করে অন্য কেউই অনুভব করতে পারবে না।