যৌবনের প্রারম্ভে গান-রচয়িতা-রবীন্দ্রনাথের চেয়ে গায়ক-রবীন্দ্রনাথের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেকেই তাঁদের স্মৃতিকথায় বলেছেন যে, রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠ ছিল ‘অতি কোমল, সুমিষ্ট আর রমণীজনোচিত।’ অর্থাৎ একটু মেয়েলি ধরনের। স্বয়ং কবিগুরু কী বলতেন নিজের গানের গলা সম্পর্কে। লিখছেন পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকার।
১৯৩৮ সালের ২৬ জানুয়ারি, মংপুতে থাকার সময় তাঁর গান শুনতে চাইলে রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছিলেন, ‘‘এখন কি আর সেই গলা আছে? গলা এককালে ছিল বটে। গাইতেও পারতুম, গর্ব করবার মতন। তখন কোথাও কোনো মিটিং-এ গেলে সবাই চিৎকার করত, ‘রবিঠাকুরের গান, রবিঠাকুরের গান’ বলে। দত্তাপহারক ভগবান দিয়ে আবার ফিরিয়ে নিলেন। তোমরা তখন ছিলে কোথায়? এখন এই ভাঙা গলার গান শুনে কি হবে?’’

অথচ যৌবনের প্রারম্ভে গান-রচয়িতা-রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) চেয়ে গায়ক-রবীন্দ্রনাথের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেকেই তাঁদের স্মৃতিকথায় বলেছেন যে, রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠ ছিল ‘অতি কোমল, সুমিষ্ট আর রমণীজনোচিত। অর্থাৎ একটু মেয়েলি ধরনের। রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) কাব্যপ্রতিভা জোড়াসাঁকোর গণ্ডি ছাড়িয়ে সমস্ত বাংলাদেশে, বিশেষ করে যুবসমাজে তুফান তুলেছিল। তাঁর দেবদুর্লভ সৌন্দর্য, বাচনভঙ্গি আর কণ্ঠযাদুর আকর্ষণে রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) প্রতিটি সভায় তাঁরা দলবেঁধে হাজির হতেন। বলা যায়, কৈশোর-যৌবনের সন্ধিক্ষণ থেকেই তাঁকে প্রায় প্রতিদিনই নানা সভা-সমিতিতে উপস্থিত থাকতে হত, দিতে হত দীর্ঘ বক্তৃতাও। আর সেই বক্তৃতা শোনার জন্য জনতা দলে দলে হাজির হয়ে ভরিয়ে তুলতেন সামনের খোলা মাঠ। প্রত্যেকটি সভার শেষে তাঁর গান শোনার দাবিতে শ্রোতাদের ঐকতান-কোলাহলে আকাশবাতাস মুখর হয়ে উঠত। বিলেতে থাকার দিনগুলিতেও কণ্ঠের যাদুতে রবীন্দ্রনাথ অতিথিদের সম্মোহিত করে রাখতেন। তখনও লাউডস্পিকার বা মাইক্রোফোনের ব্যবহার প্রচলিত হয়নি। শিল্পীকে মঞ্চ থেকে খালি গলায় গাইতে হত। রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) উদাত্ত কণ্ঠের গান মঞ্চ থেকে বিশাল অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণের দূরতম কোণেও সমানভাবে পৌঁছে যেত।

রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) জানতেন বক্তৃতার পরে তাঁকে গান গাইতেই হবে। তাই একটা ছোট্ট নোটবুকে নিজের লেখা গানগুলি টুকে রাখতেন। জনতার আবেদনে সেই খাতা থেকে একটি-দু’টি গান শুনিয়ে তিনি শ্রোতা-ভক্তদের সন্তুষ্ট করতেন। আসলে গানের সুরলোকে যাঁর বাস তাঁর মধ্যে গান গাওয়া আর গান শোনানোর এক অদম্য বাসনা নিরন্তর তাড়া করবে– এটাই তো স্বাভাবিক। ১৯০৯ সালে ‘গোরা’ উপন্যাস শেষ করে মাত্র ৯দিনে ১৮টা গান লিখে রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) কিছুদিনের জন্য কলকাতায় এসেছিলেন। তাঁকে নানা জায়গায় অসংখ্য বক্তৃতা দিতে হয়েছিল। ফলে শারীরিক ক্লান্তির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কণ্ঠস্বরেরও সমস্যা হয়েছিল কিছুটা। তেমনই এক বক্তৃতা সভায় যাওয়ার আগে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখেছিলেন, ‘দেদার বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছি। প্রাণ বেরিয়ে গেল।’

একবার ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট প্রসিদ্ধ সঙ্গীতশিল্পী এনায়েৎ খানের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথকে (Rabindranath Tagore) সভাপতির আসন অলংকৃত করেছিলেন। সভার শেষে স্যর গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কবিকে একটি গান গাওয়ার অনুরোধ করলে, রবীন্দ্রনাথ জানালেন যে, বিগত কিছুদিন ধারাবাহিক বক্তৃতা দেওয়ার ফলে তাঁর গলার স্বর ভালো নেই। আজ আর তাঁর পক্ষে গান গাওয়া সম্ভব নয়। তা সত্ত্বেও স্যর গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কবিকে উদ্দেশ্যে তীর্যক-মন্তব্য করলে, প্রচণ্ড অনিচ্ছায় রবীন্দ্রনাথকে (Rabindranath Tagore) একটা গাইতেই হয়েছিল। কিছুদিন থেকেই একটু একটু করে তাঁর গলার সমস্যা হচ্ছিল। ফলে রবীন্দ্রনাথের গলার ক্ষতির সূচনা যেন সেদিনেই শুরু। আগেকার সেই কণ্ঠস্বরও যেন একটু একটু করে সুরের আকাশের পশ্চিমদিকে ঢলে পড়ছিল। তাঁর কণ্ঠসুরের জগতে ‘অ-সুরের’ অভিশাপ গুটি গুটি পায়ের কালো ছায়া ফেললেও, রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) নিজের গান শুনিয়ে জনতাকে মুগ্ধ করতে কখনওই কার্পণ্য করেননি।

১৯২২ সালের বর্ষামঙ্গলের পরে তাঁর গলার যে ক্ষতি হয়েছিল, ঈশ্বর কোনও দিনই আর সেটা ফিরিয়ে দিলেন না। অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি, মহড়া, বিভিন্ন মানুষের কোলাহল ইত্যাদি নানা কারণে গলায় অতিরিক্ত অত্যাচারের ফলে কবির কণ্ঠস্বরের প্রভূত ক্ষতি হয়েছিল। শান্তিদেব ঘোষ তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, ‘‘খুব জোর মহড়া চলছিল, জোড়াসাঁকোর বাড়ি সরগরম হয়ে হঠাৎ ঠান্ডায় গুরুদেবের গলা গেল বসে। বর্ষামঙ্গলে তাঁর আবৃত্তি ইত্যাদি ছিল প্রধান আকর্ষণ, ভাঙা গলা নিয়ে মহা ভাবনায় পড়লেন– নানাপ্রকার ওষুধ পাচন ইত্যাদি নিজে খাচ্ছেন আমাদেরও খাওয়াচ্ছেন, আমাদেরও গলা যাতে না ভাঙে। সেই ভাঙা গলায় একটি গান রচনা করে দিনেন্দ্রনাথ ও আমাদের সকলকে ডেকে শিখিয়ে দিলেন সন্ধ্যায় গাইবার জন্য। গানটি হল ‘আমার কণ্ঠ হতে গান কে নিল ভুলায়ে।’’
২ ভাদ্র রাণু দেবীকে রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) লিখেছেন, ‘বর্ষামঙ্গল হয়ে গেল। তিন দিন হল। শেষ দিনে আমার গলা গেল ভেঙে। তাতে ক্ষতি হয়নি– কেননা আমার উপর গান গাবার ভার ছিল না– আমি কেবল মাঝে মাঝে কবিতা আবৃত্তি করব কথা ছিল। প্রথম দুই দিন করেছিলুম। তৃতীয় দিনে উঠে দাড়িয়ে পড়তে গিয়ে দেখি গলা দিয়ে আওয়াজ আর বেরয় না। কোনোরকম করে সেরে নিয়ে বসে পড়লুম। যাই হোক গানের সুখ্যাতি সকলেই করেচে।’

স্বাভাবিক স্বরে গান না-গাইতে পারার অক্ষমতা কবির পড়ন্তবেলার জীবনকে বেদনাতুর করে তুলেছিল। ৭৮ বছর বয়সে মংপুতে থাকার সময় ‘যদি হায় জীবন পূরণ নাই হল মম’ গানটি লিখে রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) ক্ষীণ, কাঁপা কাঁপা স্বরে অমিতাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। গলাও ভেঙে যেত মাঝে মাঝে। তবুও তাতে ছিল প্রাণের স্পর্শ। দুঃখ করে সুরের কাঙাল লিখেছেন, ‘তোমরা আমায় এখন একবার গাইতে ব’লেও সম্মান দাও না ৷ যখন গাইতুম তখন গান লিখতে শুরু করি নি তেমন, আর যখন গান লিখলুম তখন গলা নেই।’
তথ্যসূত্র
রবিজীবনী। প্রশান্তপাল
রবীন্দ্রজীবনী। প্রভাতকুমার মুখোপাধায়
যাত্রাপথের আনন্দগান। শান্তিদেব ঘোষ
মংপুতে রবীন্দ্রনাথ। মৈত্রেয়ী দেবী
আলাপচারী রবীন্দ্রনাথ। রানী চন্দ