‘বিপুল সংখ্যক গান লিখে থাকলেও রবীন্দ্রনাথ নিজে সেসব গানের রেকর্ডিংয়ে বিশেষ আগ্রহী হননি। হয়তো নিজের গানের গলা নিয়ে তিনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলেন না বলেই।’ রবীন্দ্র জন্মদিবসে রবীন্দ্রনাথের গায়কি এবং সামগ্রিকভাবে শিল্পের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কথা বললেন কবীর সুমন।
আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঙ্গালা ভাষার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’-এ লিখেছেন, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য নাকি একসময় গান হিসেবে গাওয়া হত। কিন্তু তার কোনও নোটেশন বা রেকর্ডিং আমরা খুঁজে পাই না, ফলে জোর দিয়ে বলার জায়গা থাকে না যে, এমনটাই হত! রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) গানের রেকর্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টা তেমনই। রেকর্ডিংয়ে যেমন মিহি, চিকন শোনায় ওঁর গলা, আদতে তেমনই ছিল বা ছিল না, কোনওটায় জোর দিয়ে বলার মতোই উপযুক্ত প্রমাণ নেই। রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) হাতে গোনা কয়েকটি গানেরই মাত্র রেকর্ডিং শুনতে পাই, যার মধ্যে ‘তবু মনে রেখো’, ‘আমার শেষ পারানির কড়ি’ ছাড়া আর বোধহয় মোটে দু-একটিই রয়েছে। তবে রেকর্ডিং যন্ত্রটির প্রচলন যে এ সময়ে ছিল, তা হলফ করে বলতে পারা যায়। আর তাতে রেকর্ডিংও নেহাত মন্দ হত না। এর উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সিঙ্গাপুর থেকে বেতারের মাধ্যমে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই রেকর্ডিংটি খুঁজলে পাওয়া যায়। সেখানে ওঁর যে স্বর শুনতে পাই, তা বিশেষ উল্লেখযোগ্য না হলেও রেকর্ডিংয়ের ফলে যে আলাদা করে বিকৃত হয়ে যায়নি, সেকথা বুঝতে পারা যায়। ফলে এত গান লিখে থাকলেও রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) যে সেসব গানের রেকর্ডিংয়ে কেন বিশেষ আগ্রহী হননি, তা জানা সম্ভব হয় না। হয়তো নিজের গানের গলা নিয়ে তিনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলেন না বলেই।

বাঙালির এক অদ্ভুত একপেশে স্বভাব রয়েছে। এমন এক দীর্ঘদেহী পুরুষ, যিনি নোবেল জয় করেছেন, শান্তিনিকেতন স্থাপন করেছেন। হাতের লেখাটি দেখার মতো; সে হাতের লেখা যখন তিনি কাটছেন, তখন তা থেকেই শিল্পকর্ম বেরিয়ে আসছে। আমি কর্মসূত্রে ওয়াশিংটন ডিসি-তে থাকতে দেখেছি, সেখানকার গ্যালারিতে রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) আঁকা ছবির প্রদর্শনী হচ্ছে। মানুষ ভিড় করছে সে প্রদর্শনী দেখতে এবং ওঁর শিল্পশৈলীর রীতিমত তারিফও করছে। বাঙালি ভাবতে চায় যে, এমন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী যে ব্যক্তিত্ব, তিনি রূপে হবেন উত্তমকুমার কিংবা গ্রেগরি পেক-এর মতো। গলার আওয়াজ হবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কিংবা দেবব্রত বিশ্বাসের মতো। কিন্তু এমনটা কি না হলেই নয়? রবিঠাকুর (Rabindranath Tagore) যে সুকণ্ঠের অধিকারী ছিলেন না, তিনি যদি নোবেল জয় না করতেন, তাহলেও কি এতখানি মেনে নিতে সমস্যা হত আমাদের?

তবে রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) যে গান গাইতে ভালোবাসতেন, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আর তা হবে না-ই বা কেন? ধূর্জটিপ্রসাদ লিখে গিয়েছেন যে, রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) অন্তত শ’খানেক ধ্রুপদ গেয়ে দিতে পারতেন। ১৭-১৮টা খেয়াল, বন্দিশ উনি গেয়েছেন, এমনও নজির রয়েছে লিখিতভাবে। বনফুলের লেখা ‘রবীন্দ্রস্মৃতি’-তে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ওঁর শান্তিনিকেতন ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা রয়েছে। সেখানে বনফুল লিখেছেন যে, রাত্রিবেলা খাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ ওঁকে ডেকেছেন নিজের ঘরে। গল্প-আড্ডার মাঝে কবিগুরু তরুণ লেখকটিকে বলছেন, ‘গান শুনবি? আমি এখন একটু একটু গাইতে পারি।’ সত্যিই তো, কণ্ঠস্বর যেমনই হোক, এত গান সৃষ্টি করেছেন যে মানুষটা, তাঁর নিজের লেখা গান গাইতে ইচ্ছে করবে না, এমন কখনও হতে পারে?

রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) যে গান গাইতেন, এ কথা আরও জোর দিয়ে বলা যায় কারণ তা না হলে, সুর সম্পর্কে এমন স্পষ্ট ধারণা কারও থাকতে পারে না। মালতী ঘোষের বাবার একটি ছোট রেকর্ডিং স্টুডিও ছিল। এ কথা তিনি রবীন্দ্রনাথকে জানিয়ে ছিলেন। এবং রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) সেখানে গিয়ে বেশ কিছু গান রেকর্ডও করেছিলেন। শোনা যায়, তিনি নিজে হাতে অর্গানও বাজাতেন রেকর্ডিংয়ের সময়ে। সে বাজনা একেবারে ‘প্রফেশনাল’ স্তরের না হলেও, যথেষ্ট ভালো! তবে কলকাতায় প্লেগ হল যখন, তখন এই সমস্ত নথিপত্র নাকি উড়িয়ে দেওয়া হয়। আপামর বাঙালির কাছে এর চাইতে দুর্ভাগ্য আর কী-ই বা হতে পারে!

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় মহাশয় শিলাইদহের বাড়িতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন। এ তো বোঝাই যায় যে, তিনি যথেষ্ট কাছের লোক ছিলেন রবীন্দ্রনাথের। অথচ সেই দ্বিজেন্দ্রলাল রায় পরবর্তীকালে তাঁর ‘আনন্দবিদায়’ নাটকে লিখেছিলেন, ‘মম অঞ্চল দড়ি বন্ধন গরু গোয়ালেতে ফিরে এসো হে’। এ যে নেহাতই রবীন্দ্রনাথ গান লেখার ধরনকে কটাক্ষ করে লেখা, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকী, আধুনিক সময়ের বহু সংগীতশিল্পী যাঁরা মূলত রবীন্দ্রসংগীত গেয়েই নিজেদের সংগীতজীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন, তাঁরাও সময়ে-অসময়ে রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) কণ্ঠস্বরকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি। সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি এক সময় উন্মুক্ত পিঠে রবিঠাকুরের গানের কলিকে রীতিমতো বিকৃত করে লিখে রেখেছে, এমনও হয়েছে। শুধু গান নয়, অনেকে এ কথাও বলেছেন যে ওঁর আঁকা নাকি রেমব্র্যান্টের নকল! এতখানি গুণী মানুষ যে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউই কোথাও ছিল না, তা তো বলা যায় না। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায় যে, রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) যদি নোবেল না পেতেন, এতখানি খ্যাতির শিখরে জায়গা না পেতেন, তাহলে হয়তো ওঁর লিখনশৈলী বা চিত্রকলার আঙ্গিকের মতোই কণ্ঠস্বর নিয়েও আরও অনেক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মুখে পড়তে হত তাঁকে।