রোগক্লিষ্ট সংক্ষিপ্ত জীবনে সৃষ্টি করেছেন অসামান্য সব সুর, যথার্থ স্বীকৃতি বা প্রেম শপ্যাঁ’র ভাগ্যলিপিতে সবই ছিল অধরা

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 7, 2021 11:45 pm|    Updated: April 15, 2021 5:40 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 7, 2021 11:45 pm Updated: April 15, 2021 5:40 pm

ওয়ারশতে তাঁর জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লেখা হয়েছিল। দেখা হল একটি আশ্চর্য মেয়ের সঙ্গে। মেয়েটির নাম কন্সটানসিয়া গ্লাডস্কা। তার প্রতি শপ্যাঁর মুগ্ধতা সীমাহীন। এঁকে উদ্দেশ্যে করে বানিয়েছিলেন বিখ্যাত দুটি পিস, ‘ওয়ালটজ্ ইন ডি ফ্ল্যাট’ এবং ‘এফ মাইনর কনচের্তো’র আদাগিও’।
কিন্তু মেয়েটি তাঁর প্রতিভা অথবা হৃদয়াবেগ বিশেষ বুঝতে পারেনি। সে অন্য একটি পুরুষের প্রতি আসক্ত হয়ে, সম্পর্কে জড়ায়। শপ্যাঁ হৃদয়বেদনা নিয়ে পাকাপাকিভাবে প্যারি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দেশ ছাড়ার আগে, বাল্যের শিক্ষক এলসনারই’র সঙ্গে দেখা করেন। প্রিয় শিক্ষক একটি রূপোর পানপাত্রে ভরে তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন পোল্যান্ডের পবিত্র মাটি।

শপ্যাঁ তখন ভিয়েনাতে। পোল্যান্ডে রুশ আগ্রাসন আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পোল্যান্ডের মানুষ সমস্ত শক্তি দিয়ে এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ছেন। তাঁর নোটবুকে লিখলেন, ‘আমার বাবা-মা আর বন্ধুদের জন্য অসম্ভব চিন্তা হচ্ছে। হয়তো উইলিস ট্রেঞ্চে মরে পড়ে আছে, মার্সেলের ঠাঁই হয়েছে কোনও হাজতে, আমার বেচারা বাবা হয়তো অভুক্ত অবস্থায় রয়েছেন, মায়ের পক্ষে খিদের রুটি কেনা সম্ভব হয়নি। হয়তো কোনও রাশিয়ান তাঁকে খুন করেছে। আমার দিদিকেও, আমার বাবা সেসব রুখতে পারেননি। আর আমি এখানে পিয়ানোতে হতাশা উগরে দিচ্ছি’।
শেষরক্ষা হল না, এই বছরের সেপ্টেম্বরে রুশেরা পোল্যান্ডের দখল নিল। দিশেহারা শপ্যাঁ তাঁর বন্ধুকে চিঠিতে লিখলেন, ‘আমি কি প্যারিতে যাব না দেশে ফিরে যাব—এখানে বসে থাকব নাকি আত্মহত্যা করব কিছুই বুঝতে পারছি না’। হতাশা বিষাদ এবং দুশ্চিন্তার গভীর কালো মেঘ মাথায় নিয়ে দেশের উদ্দেশ্যে তৈরি করলেন, ‘এটুড ইন সি মাইনর’। স্বদেশপ্রেমিকের এমন সুরেলা অভিব্যাক্তি সংগীত ইতিহাসে বিরল।

প্রথম বড় স্বীকৃতি পেলেন, রবার্ট শুমানের তরফ থেকে। শুমান শপ্যাঁকে নিয়ে লিখলেন,—‘hats off gentlemen—a genius’. এখান থেকেই শুরু হল, তাঁর উড়ানের আরেক অধ্যায়। সেই সময়ের প্যারিতে উপস্থিত সমস্ত কম্পোজারদের সাথে তাঁর নিপাট বন্ধুত্ব হয়ে গেল। সে তালিকায় আছেন, বেরলিউওজ, চেরুবিনি, রসিনি এবং বিশেষ করে লিস্ট্জ। প্যারিতে তিনি যেখানে থাকতেন, তার মাত্র কয়েক ব্লক দূরে থাকতেন, লিস্ট্জ। শপ্যাঁ তাঁর তৈরি ‘ওপি টেন এটুড’ উৎসর্গ করলেন তাঁকে।

বিখ্যাত ধনকুবের রথচাইল্ডের বাড়িতে তাঁকে নিয়ে গেলেন একজন। বিরাট সংগীতের আসর। ঘরভর্তি সব ধনকুবের এবং সংগীত বোদ্ধা সব নাক উঁচু সমালোচক। ঝাড়া তিন ঘণ্টার অনুষ্ঠানে পিয়ানোতে ঝড় তুললেন। সবাই বিস্ময়ে হতবাক। বাজনা অনেকেই অনেক শুনেছেন। কিন্তু এমন বাজনা শোনেননি কেউই। সকলেই আশ্চর্য। এই অনুষ্ঠানের পর, সমস্ত ধনীরা তাঁদের সন্তানকে তাঁর কাছেই বাজনা শেখাতে চান। প্রায়ই ডাক আসতে লাগল বিরাট সব ঘরোয়া আসরে। অর্থ-প্রতিপত্তি-জনপ্রিয়তা তুমুল বাড়তে লাগল তাঁর।

মারিয়া নামের এক মেয়ের সাথে শপ্যাঁর বাগদান হয়েছিল। মারিয়ার বয়স যখন ছিল এগারো, তখন পোল্যান্ডে তার সাথে শপ্যাঁর খানিক আলাপচারিতা ছিল। কিন্তু বাগদানের পর, মারিয়ার মা তাঁকে চিঠি লিখে জানান, এই সম্পর্ক থেকে যেন শপ্যাঁ তাঁর মেয়েকে নিষ্কৃতি দেয়। তাঁরা ইতিমধ্যে কানাঘুষো শুনেছেন, খবর পেয়েছেন শপ্যাঁ অরোরা দুদেভাঁর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে।

জর্জ ততদিনে দুই সন্তানের জননী। নারীবাদী। পুরুষালি গড়নের চেহারার জন্য অনেকেই তাঁকে কটাক্ষ করেন। ঢোলা পাতলুন পরেন, নভেল লেখেন, সিগার ফোঁকেন। জর্জের বয়স তখন চৌত্রিশ, শপ্যাঁর আঠাশ। এই অসম সম্পর্ক সেই সময় প্যারিতে বেশ আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল।

অরোরা দুদেভাঁ অনেকের কাছেই ছিলেন অনাকর্ষণীয়া। ইতিমধ্যেই স্বামী ব্যারন দুদেভাঁকে ছেড়েছেন। দীর্ঘদিনের প্রণয়ী বন্ধু কবি দ্য মুসের সঙ্গেও সম্পর্ক ছেদ করেছেন। প্রথম আলাপে শপ্যাঁর খুব একটা অরোরাকে ভালো লাগেনি। কিন্তু মারিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার হতাশা থেকে নিষ্কৃতির জন্য, তিনিও অবলম্বন খুঁজছিলেন।

এই সময়ে তাঁরা ম্যাজরাকা দ্বীপে বেড়াতে গেলেন। পাক্কা এক বছর সেখানে যুগল কাটালেন। সঙ্গে অবশ্য অরোরার সন্তান-সন্ততি ছিল। এখানের আবহাওয়া চীর-দুর্বল শপ্যাঁর স্বাস্থ্যোদ্ধারে সহায়ক হবে বলেই অরোরার আশা ছিল। কিন্তু শপ্যাঁর স্বাস্থ্য ফেরার আশা যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেলো। এখানে বসেই তিনি বানিয়ে যেতে লাগলেন একের পর এক সংগীত। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, Op 24 Preludes, F major Ballade Op 38, C sharp minor Scherzo Op 39.

আফ্রিকান সূর্য, গভীর নীলাভ সমুদ্র, মাথার ওপরে আকাশে চক্কর কাটা ঈগল। এইসব শপ্যাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। অরোরা এখানের স্থানীয় বাসিন্দাদের আচরণে বরং চূড়ান্ত বিরক্ত ছিলেন। বাসিন্দারা চূড়ান্ত ক্যাথালিক, যাঁরা কিছুতেই অববাহিত যুগলকে একসঙ্গে থাকতে দিতে নারাজ।

শুনুন…

লেখা: সুশোভন প্রামাণিক
পাঠ: সুশোভন প্রামাণিক
আবহ: শুভাশিস চক্রবর্তী

পোল