কাশ্মীরি শালওয়ালাকে অকারণ আক্রমণই হোক, বা গর্ভবতী মুসলিম মহিলার চিকিৎসা করতে রাজি না হওয়া – সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ যে কতখানি তৃণমূল স্তরে ছড়িয়ে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বারবারই। কিন্তু ধর্মীয় বিদ্বেষ কি আষ্টেপৃষ্ঠে ধরছে শিল্পীকেও? প্রশ্ন উঠছেই। শিল্পের তো কোনও সীমা নেই। নেই কোনও বেড়াজাল। তাহলে কেন ধর্মের শিকলে আটকে যাবে সেই সৃজনশীল ভাবনা? কেন, প্রাণ খুলে হাসতেও দেখাতে হবে পরিচয়পত্র?
নীতিশিক্ষার পাঠ পড়ানো শিল্পের কাজ নয়, শিল্প কেবল চারপাশে যা ঘটছে তাকেই তুলে ধরতে পারে সকলের সামনে। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে নানা সময়ে নানান শিল্পী একমত হয়েছেন এই প্রসঙ্গে। কিন্তু তা বলে কি সমাজের প্রতি কোনও দায়ই থাকে না শিল্পের? বিশেষ করে সেই শিল্প যদি বৃহত্তর অংশের মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা রাখে? সম্প্রতি এক পাকিস্তানি দর্শকের উদ্দেশে কৌতুকশিল্পী গৌরব গুপ্তার (Comedian Gaurav Gupta) করা মন্তব্য নিয়ে তাই দ্বিধাবিভক্ত নেটনাগরিকেরা।
কমেডিয়ান হিসেবে রীতিমতো জনপ্রিয় গৌরব গুপ্তা (Comedian Gaurav Gupta)। কিছুদিন আগে ‘ইউএস-কানাডা কমেডি ট্যুর’-এর অংশ হিসেবে তাঁর স্ট্যান্ড-আপ পারফরম্যান্স চলাকালীন এক দর্শকের সঙ্গে কথালাপ শুরু হয় গৌরবের। তিনি নিজেকে পাক নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতেই চারপাশের ভিড় থেকে ‘সিঁদুর, সিঁদুর’ স্লোগান ওঠে। বলা বাহুল্য, গত ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পালটা জবাব দিতে ভারত যে পাকিস্তান এবং পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযান চালায়, এ স্লোগান তারই পরিপ্রেক্ষিতে। গৌরব দর্শকদের শান্ত হতে বলেন ঠিকই, কিন্তু এরপর থেকেই গতিপথ বদলায় তাঁর পারফরম্যান্সের বিষয়বস্তু। বেশ অনেকখানি সময় ধরে একের পর এক কথার তীরে তিনি বিঁধতে থাকেন ওই পাক নাগরিককে। কখনও এক ভারতীয়র কমেডি শো-তে আসার জন্য মশকরা করেই তাঁর সাহসের প্রশংসা করেন, কখনও আবার হনুমান চালিশা পড়ে শোনাতে বলেন জনসমক্ষে! এমনকী বহু বছর ধরে কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে চাপানউতোর, সেদিকেও ইঙ্গিত করেন গৌরব (Comedian Gaurav Gupta)। যে প্রসঙ্গ তুলে দর্শকদের অধিকাংশের বাহবাও কেড়ে নেন কমেডিয়ান।
তবে একজন কৌতুকশিল্পী হিসেবে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়কে হাস্যরসাত্মক মোড়কে পেশ করা কতখানি যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে দুই দলে ভাগ হয়ে গিয়েছে নেটপাড়া। গৌরব গুপ্তার (Comedian Gaurav Gupta) সোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের কমেন্টবক্স দেখলে তা স্পষ্টতই বোঝা যায়। অনেকে তাঁর কমিক সেন্সের ভূয়সী প্রশংসা করলেও, কেউ কেউ এ ঘটনাকে কুরুচিকর বলে মনে করেছেন। তাঁদের মতে, ভারতীয় ও পাক নাগরিকদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ প্রায়শই চোখে পড়ে, তা চিন্তাজনক।
পহেলগাঁওয়ে ধর্ম জিজ্ঞেস করে হত্যালালী চালিয়েছিল জঙ্গিরা। গুলি করার আগে পুরুষদের কলমা পড়ার নিদান দেওয়া হয়েছিল। মার্কিন মুলুকে বসে কমেডিয়ানের মশকরা করে হনুমান চালিশা পড়তে বলা কি তারই পালটা? ধর্মীয় বিদ্বেষ কি আষ্টেপৃষ্ঠে ধরছে শিল্পীকেও? প্রশ্ন উঠছেই। শিল্পের তো কোনও সীমা নেই। নেই কোনও বেড়াজাল। তাহলে কেন ধর্মের শিকলে আটকে যাবে সেই সৃজনশীল ভাবনা? কেন, প্রাণ খুলে হাসতেও দেখাতে হবে পরিচয়পত্র?
কাশ্মীরি শালওয়ালাকে অকারণ আক্রমণই হোক, বা গর্ভবতী মুসলিম মহিলার চিকিৎসা করতে রাজি না হওয়া, সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ যে কতখানি তৃণমূল স্তরে ছড়িয়ে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বারবারই। নেটিজেনদের একাংশ বলছেন, যখন কোনও সেলিব্রিটির শো দেখতে এত বিপুল সংখ্যক মানুষ ভিড় করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছু দায়বদ্ধতার প্রশ্ন এসে যায় সেখানে। কমেডির মঞ্চে সিনেমা, রাজনীতি, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান থেকে খেলার দুনিয়া, কিছুই বাদ যায় না। তার জন্য অনেক সময় প্রভাবশালীদের রোষানলেও পড়তে হয় কমেডিয়ানদের। কিন্তু শিল্পীর মূল্যবোধ যে সমাজের সম্পদ! তার শরীরে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার ক্ষত লাগবে কেন?