কলকাতা-ডার্বির ডায়রি ঘেঁটে

Published by: Sankha Biswas |    Posted: November 27, 2020 5:30 pm|    Updated: November 27, 2020 7:30 pm

Published by: Sankha Biswas Posted: November 27, 2020 5:30 pm Updated: November 27, 2020 7:30 pm

চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন ফুটবলের রাজপুত্তুর। পেরয়নি ২৪ ঘণ্টাও। তাঁর স্পোর্টসম্যান স্পিরিটের নির্যাসটুকু বুকে রেখেই এই মুহূর্তে মহারণের জন্য প্রস্তুত শোকস্তব্ধ ভারত। এবং অতি অবশ্যই বাংলা। মাণ্ডবী নদীর তীরে আজ আইএসএল–এর ইতিহাসের প্রথম ডার্বি। সম্মুখসমরে শতবর্ষ পেরনো দুই ক্লাব। এটিকে মোহনবাগান আর এসসি ইস্টবেঙ্গল। আর ব্যাকস্টেজে চিলচিৎকার: লেট্‌স ফুটবল…!

হোক না গোয়ায়, মোহন–ইস্ট ডার্বির ইতিহাস শ্লাঘাভরে গায়ে মেখেছে কলকাতা।

“World’s most popular and enduring rivalries’— আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন ফিফা ঠিক এই ভাষাতেই বর্ণনা করেছে এটিকে মোহনবাগান-এসসি ইস্টবেঙ্গল ডার্বি ম্যাচকে। বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে সেরার সেরা তকমা পাওয়া এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ নিজেই এক ইতিহাস। ভারতীয় ফুটবলের সেরা আকর্ষণ।

এসসি ইস্টবেঙ্গল-এটিকে মোহনবাগান মানে শুধু ফুটবল নয়; নাম দু’টি বাঙালির আবেগ আর অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। শেষ ১০০ বছরের ইলিশ-চিংড়ির লড়াই নিছক ম্যাচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তৈরি করে নিয়েছে নিজস্ব একটা ব্র্যান্ড।

এমনিতে ‘ডার্বি’ (Derby) শব্দটি এসেছে ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতা থেকে। তবে ফুটবলের ক্ষেত্রে সেইসব ম্যাচিই ডার্বির তকমা পায় যে-ম্যাচে এমন দুই দল মুখোমুখি হয় যারা একই স্থানীয় পরিসরে সম্পূর্ণ বিরোধী ও বিবাদী অবস্থানে রয়েছে। এই বিরোধ এবং বিবাদের ভিত্তি নিছক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের স্বার্থে হতে পারে। কিংবা হতে পারে আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক কারণে। বিশ্বের ফুটবল ইতিহাসে এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন ডার্বি। যেমন ব্রাজিলে ফ্ল্যামেঙ্গো বনাম ভাস্কো, আর্জেন্তিনায় বোকা জুনিয়র্স বনাম রিভারপ্লেট; ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ডার্বি— ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বনাম ম্যানচেস্টার সিটি; স্পেনের মাদ্রিদ ডার্বি— রিয়েল মাদ্রিদ বনাম অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদ। ফুটবলের মক্কা কলকাতায় ঠিক তেমনই এসসি ইস্টবেঙ্গল-এটিকে মোহনবাগান ডার্বি— এশীয় ফুটবলের সেরা আকর্ষণ। আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন ফিফা–র বিচারে এই ডার্বি ‘Classical Football Derby’.

ইতিহাসের প্রথম মোহন–ইস্ট ডার্বিটি খেলা হয়েছিল কবে? ডার্বির ডায়রি বলছে মোহন–ইস্ট ডার্বির ইতিহাস ২০২০–তে ৯৫ বছরে পা রাখতে চলেছে। ১৯২৫ সালের ২৮ মে খেলা হয়েছিল ইতিহাসের প্রথম কলকাতা ডার্বি।

একসময় আইএফএ শিল্ড–ই ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় ফুটবল প্রতিযোগিতা। ১৯১১-তে এই টুর্নামেন্টের ফাইনালেই ইস্ট ইয়র্কশায়ারকে হারিয়ে মোহনবাগান ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। বুট পরা বিদেশিদের বিরুদ্ধে খালি পায়ে খেলেই অমর একাদশে নিজেদের নাম লিখিয়েছিলেন শিবদাস ভাদুড়ী, অভিলাষ ঘোষরা।

’৬৯-এ সেবার অমল দত্ত মোহনবাগানের ট্যাকটিকাল কোচ। ২-৩-৫ ছকের বদলে ৪-২-৪ ছকেই খেলাচ্ছিলেন তিনি। এটাই ছিল সেই বিখ্যাত ‘ডায়মন্ড প্ল্যান’। উইংব্যাকরা ওভারল্যাপে গিয়ে ফরোয়ার্ডদের গোল করতে সাহায্য করবে। সেবছর সবুজ–মেরুনে এই ফর্মুলা দুরন্ত কাজ করেছিল। কিংবদন্তি ভারতীয় গোলকিপার পিটার থঙ্গরাজ সেদিন ইস্টবেঙ্গলের গোল আগলালেও প্রণব গঙ্গোপাধ্যায়কে আটকাতে পারেননি। স্কোরশিটে নাম উঠেছিল সুকল্যাণ ঘোষ দস্তিদারেরও। লাল–হলুদ ডিফেন্স নিয়ে ওই ম্যাচে কার্যত ছেলেখেলা করেই সেবার শিল্ড ঘরে তুলেছিল মোহনবাগান।

১৯৭৫–এর ৫-০ র বদলা ৫-৩ এ নিয়েছিল মোহনবাগান। এই ম্যাচে সবুজ–মেরুন জার্সিতে ঝলসে উঠেছিলেন চিডি এডে। চার–চারটি গোল করেছিলেন তিনি। ২৫ অক্টোবর যুবভারতীতে আরও একটা নজির গড়েছিলেন এই নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার। একমাত্র বিদেশি ফুটবলার হিসেবে ডার্বিতে হ্যাটট্রিক করেছিলেন৷ পাশাপাশি কোনও একটি ডার্বিতে সর্বোচ্চ গোল করারও নজির গড়েন তিনি৷

সোনালি এইসব মুহূর্তের পাশেই রয়েছে একটি কালো দিন, ১৯৮০-র ১৬ আগস্ট। কলকাতা ময়দানের কালো দিন। ইডেন গার্ডেনে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচ দেখতে এসে সেদিন আর বাড়ি ফেরেনি ১৬টি তরতাজা প্রাণ৷ স্টেডিয়ামের ডি ব্লকে অতিরিক্ত দর্শক প্রবেশ করায় সেই ভিড় সামলাতে ব্যর্থ হয় পুলিশ৷ নিজেদের মধ্যে ধস্তাধস্তি করে প্রাণ হারান দুই দলের সমর্থকরা৷

ডার্বি ঘিরে এই উত্তেজনা, রেষারেষি স্টেডিয়ামের ভিতরে–বাইরে, ম্যাচের আগে–পরে প্রায়ই আইন শৃঙ্খলার সমস্যা ডেকে আনত। দু’দলের সমর্থকদেরই আক্রমণ–প্রতি আক্রমণে বহুবার ভেঙেছে শালীনতার প্রাচীর, ভদ্রতার ব্যারিকেড।সত্তর কিংবা নব্বই-এর দিনগুলির মতো উত্তেজনা আজ হয়তো নেই আর, তবু আজও ইস্ট-মোহন ডার্বির স্বাদে বাঙালির রসনা বাজারে ইলিশ অথবা চিংড়ির ডুয়েল অব্যাহত। কেননা এই ডুয়েল বাঙালির আবেগের সঙ্গে জড়িত, আর কে না জানে বাঙালি চিরকালের ‘সেন্টিমেন্টাল ফুল’?

লেখা: সানু ঘোষ
পাঠ: সুশোভন প্রামাণিক
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল