ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘ফার্স্ট পার্সন’: অসহযোগ

Published by: shono_admin |    Posted: October 13, 2020 7:48 pm|    Updated: November 9, 2020 1:56 pm

Published by: shono_admin Posted: October 13, 2020 7:48 pm Updated: November 9, 2020 1:56 pm

সংবাদ প্রতিদিন-এর ‘রোববার’ পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকে দীর্ঘদিন সম্পাদক ছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাঁর সম্পাদকীয় কলামের পোশাকি নাম ছিল ফার্স্ট পার্সন। এই কিংবদন্তি স্রষ্টার সেই মাস্টারপিস লেখার কিছু নির্বাচিত পর্ব পড়ে শোনাচ্ছেন তাঁরই এক সময়ের সহকর্মী অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। রইল তার দ্বিতীয় কিস্তি।

আমরা, বাংলার মানুষ, অহিংস আন্দোলন বড় একটা দেখিনি। আমাদের নায়ক ক্ষুদিরাম বসু, বিনয়–বাদল–দীনেশ, চট্টগ্রামের মাস্টারদা। আমরা ছোট্টবেলা থেকে, কিচ্ছু না জেনে না বুঝে, গলা ফাটিয়ে বলে এসেছি— ‘না গান্ধী নয়। সুভাষচন্দ্র।’ ভেবে দেখেছেন কখনও, কেন?

আপাত একটা কারণ অনুমান করতে পারি। সুভাষচন্দ্র বীর যোদ্ধা। তিনি সামরিক পোশাক পরেন। আর, গান্ধী বৃদ্ধ, অশক্ত— তাঁকে নায়কোচিত ভাবা মুশকিল।

অবলীলায় স্বীকার করতে পারি, আমি নিজেও বহুদিন তাই ভাবতাম। মনে হত মহাভারতের দ্রৌপদী আর গান্ধী যেন এক. কথায় কথায় প্রায়োবেশন। ‘এ আবার কী আহ্লাদেপনা। খাবি না খাবি না— নিজে বোঝগে যা! আর লোকগুলোই বা কী? সাধতেই বা যায় কেন?’

পরে বুঝেছি, এই সত্যাগ্রহ অন্তরের শক্তি। প্রতিবাদের এক চূড়ান্ত প্রতিমা। যার সামনে গিয়ে সমস্ত অত্যাচার কুঁকড়ে, গুটিয়ে ফিরে আসে।

মেদিনীপুরের জুনপুট অঞ্চলে একটা গ্রাম আছে— নাম পিছাবনি। শুনেছি, আদিতে নাকি নাম ছিল কমলাপুর (বোধহয় ভুল বলছি না)। লবণ আইন অমান্যর সময় স্থানীয় মহিলারা মাটি আঁকড়ে বসে পড়েছিলেন সেখানে। পুলিশের লাঠির গুঁতোর মুখে একটাই কথা হলছিলেন— পিছাব নি(অর্থাৎ, পিছোব না)।

সেই সমবেত স্বর আজ সেই গ্রামের পরিচয়। তার ইতিহাস, তার পুরাণ।

যতদূর জানি, কম্যুনিজম বলে— শেষ অবধি নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করার জন্য মধ্যপথে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমাজ বা রাষ্ট্রশাসনের অধীন হতে হবে।

সত্যাগ্রহ বলে— অহিংসার পথে কোনওদিনই ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে সমাজের শাসনের কাছে পদানত করবার প্রয়োজন নেই।

সত্যিই, প্রয়োজন নেই। মারের মুখে প্রশান্তি অনেক বড় পাল্টা মার। তার আর কোনও মার নেই।

সিঙ্গুর জমিরক্ষা কমিটির বহু মানুষ, বহু পর্যায়ে নিশ্চুপে নির্বিরোধে অনশন করে বহুদিন পরে আবার নতুন করে বুঝিয়ে দিলেন সেই অন্তরতম শক্তির বিস্তার। তাঁদের কোনও ছবি উঠল না। তাঁদের নাম আমরা জানলাম না। তাঁরা দিব্যি বুঝতে পারলেন যে এই মানচিত্রেরই অন্য কোথাও তাঁরা কখনও রাজনৈতিক ফায়দার হাতিয়ার, বা মিডিয়ার লোভনীয় স্টোরি— তবু কিছু বললেন না।

এক চিত্রসাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সে বলল, ‘কোনও সময় পাচ্ছি না, জানো? সকাল থেকে সিঙ্গুরে গিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে তো।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোরা তো সিঙ্গুর নিয়ে কিছু লিখছিস না। তবে যাচ্ছিস কেন?’ বলল, ‘না, না! বুঝতে পারছ না, যদি কিছু ঘটে যায়?’

ঘটে যায় মানে? প্রতিনিয়ত যেটা ঘটছে, এতগুলো মানুষের এতদিনের অস্তিত্বের সংকট— সেটা ঘটনা নয় যথেষ্ট?

সিঙ্গুরে পাঁচশো বাচ্চা একদিন অনশন করছে— সেটা ঘটনা নয়? আর বিধানসভা ভগ্নদশা দেখতে এসেছে ক’টা বাচ্চা, সেটা ঘটনা? চৌরঙ্গির ধরনামঞ্চে কে এলেন, কে এলেন না; তাপসীকে পুড়িয়ে মারার আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল কি হয়নি; চব্বিশ ঘণ্টার বন্‌ধ হবে না আটচল্লিশ ঘণ্টার,— এগুলো তাহ’লে ঘটনা কেবল? চমৎকার!

মিডিয়া বড় চতুরভাবে, কখন কে সবার অজান্তে, কোনও একটা আন্দোলনের গায়ে একটা বিশেষ মানুষের পোস্টার সেঁটে দেয় সেটা বুঝতেও দেয় না। এমনভাবে দেয়, যাতে সেই মানুষটার ব্যক্তিগত ত্রুটি–বিচ্যুতিগুলিই আন্দোলনটার স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়।

বন্‌ধ হয়েছে কি হয়নি, তাতে কার জয় হয়েছে, কে পরাজিত— সেটা কি সত্যিই বিবেচ্য?

আমরা প্রশাসনের ঔদ্ধত্য নিয়ে অনেক কথা বলছি। কিন্তু যখন আচমকা একটা রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে হঠাৎ একটা বন্‌ধের ডাক ছুড়ে দেওয়া যায়, সেটা কি কম উদ্ধত?

কাদের জন্য বন্‌ধ? তাঁরা কি চেয়েছেন বন্‌ধ? সিঙ্গুরের মানুষদের একবার জিজ্ঞেস করেছি আমরা? তাঁদের না জানিয়ে তাঁদের হয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া— তাঁদের অবমাননা নয়?

এই কথাটা তো কেউ বললেন না। সাধারণ মানুষের অসুবিধের কথা বললেন, হাইকোর্টের অর্ডারের কথা উঠল। কেউ তো বললেন না, যে এই সত্যাগ্রহে অনমনীয়তার কোনও স্থান নেই।

সিঙ্গুর আর কেবল একটা স্থাননাম নয়। বাংলার মানুষের ইতিহাসে হয়তো সিঙ্গুর কথাটা এখন থেকে ‘আন্দোলন’ এর সমার্থক হয়ে দাঁড়াল। যে আন্দোলন সাধারণ মানুষের। যেখানে নেতৃত্ব দেবার আমরা কেউ নই। তৃণমূল নয়, সি পি এম নয়, বুদ্ধিজীবীরাও নন…

আমাদের মধ্যে একটা প্রচলিত সৌখিন বুলি আছে, ‘চল, আমরা গ্রামে গিয়ে কাজ করি। এদের শেখাই।’ এই নাগরিক উন্নাসিকতা একটু দূরে সরিয়ে রেখে তাকালেই দেখতে পাব, যে আমরা গ্রামকে শেখাব কয়েকটা ইংরিজিতে লেখা অক্ষর। আর, গ্রাম আমাদের শেখাবে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস। যার কাছে আমরা সকলেই নতজানু। যার চোখে চোখ রাখবার মতো ক্ষণজন্মা বড় কম। কালেভদ্রে, একটা কার্ল মার্ক্স… একটা রবীন্দ্রনাথ… ব্যস্।

এই আন্দোলনে কোনও নায়ক নেই, কোনও খলনায়ক নেই। আছে এক প্রবহমান সভ্যতা। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা সকলে। আমাদের সীমিত বোধ আর অসীম অর্বাচীনতা নিয়ে।

আসুন, একবার অন্তত সবাই মিলে সেই সভ্যতার শরিক হই। তার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালে আপনিই বুঝতে পারব— সত্যিকারের উন্নয়ন কাকে বলে।

আশা করতে বড় ভয় হয়, তবু কামনা তো করতে পারি— দু হাজার সাত সকলের জন্য শুভ হোক। সর্বজনীন কল্যাণের হোক।

মমতা, আপনাকে বলছি। মহাশ্বেতাদি আপনাকে অনুরোধ করেছেন— অনশন ভাঙতে, নতুন করে নেতৃত্ব দিতে, ইত্যাদি ইত্যাদি…

আমি কেবল একটা ছোট্ট অনুরোধ করব?

দয়া করে কয়েকদিনের জন্য অন্তত মিডিয়ার ক্যামেরাকে প্রত্যাখ্যান করুন।

যদি সত্যিই সত্যাগ্রহে বিশ্বাস করে থাকেন, তার এই অপরিসীম শক্তিকে লঘু করে দেবেন না।

ভাল থাকুন সবাই।

৩১ ডিসেম্বর ২০০৬

লেখা: ঋতুপর্ণ ঘোষ
পাঠ: অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল