সমাজে বৈষম্য ও মৌলবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠলেও তার বিরুদ্ধে জারি থাকে লাগাতার লড়াই, দুই লড়াকুর গল্প

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: May 17, 2021 7:36 pm|    Updated: May 17, 2021 11:08 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: May 17, 2021 7:36 pm Updated: May 17, 2021 11:08 pm

মধ্যপ্রদেশের একটি ছোট মফস্‌সলে জন্ম কৈলাস সত্যার্থীর। অপরিসীম দারিদ্র্য কীভাবে মানুষের শিক্ষা, বড় হয়ে ওঠাকে ব্যহত করে করেছে তা তিনি দেখেছেন নিজের কৈশোর ও যৌবনে। অনুভব করেছেন অভাবের তাড়নায় শিশু-শ্রমিক হয়ে যাওয়া এবং অশিক্ষিত থেকে যাওয়া মানুষগুলোর বঞ্চনা এবং তা থেকে হওয়া সমাজের সার্বিক ক্ষতি। এসবই গভীরভাবে ভাবাত কৈলাসকে। তাই তিনি ১৯৮০ সাল নাগাদ ইতি টানলেন ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যাপনার পাকা চাকরি থেকে। শামিল হলেন ‘বচপন বাঁচাও’ আন্দোলনে। মনের জোর আর লক্ষ্যে স্থির থেকে তিনি এই আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক স্তরে  নিয়ে যেতে সফল হন এক দশক সময়ের মধ্যে। ‘গ্লোবাল মার্চ এগেইন্স্ট চাইল্ড লেবার’-এর মতো কর্মযজ্ঞ তিনি না থাকলে বাস্তবায়িত হত না। পৃথিবীজুড়ে শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে এমন লড়াই যিনি করেন তাঁকে স্বীকৃতি না জানালে তো সভ্যতার অকল্যাণ।

আর মালালা ইউসুফজাই? তাঁর লড়াইটা আবার অন্যরকম, একটু বিপজ্জনক। পিছন ফিরে দেখা যাক। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়।    

১৯৯৭-এর ১২ জুলাই। পাকিস্তানের সোয়াট উপত্যকার মিঙ্গোরা শহর। এক পাস্তু মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মালালা ইউসুফজাই। বাবা, মা, দুই ছোট ভাই আর মালালা– এই নিয়ে পরিবার। বাবা জিয়াউদ্দিন ইউসুফজাই একজন সমাজসেবী এবং শিক্ষাবিদ। সোয়াট একসময় ছিল অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পাহাড়ি উপত্যকা। ‘সুইৎজারল্যান্ড অফ পাকিস্তান’। এমনকী, মালালা যখন জন্মান সেই সময়েও এই উপত্যকা বেশ শান্তিপূর্ণ ছিল। ২০০৮ সালে ‘তেহরিক-ই-তালিবান’ সোয়াট দখল করে। স্থানীয় তালিবান নেতা মোল্লা ফজলুল্লাহ বিভিন্ন ‘ইসলামিক আইন’ ধার্য করে। যার মধ্যে অন্যতম ছিল: মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমস্ত ভেঙে বা বন্ধ করে দেওয়া; মেয়েরা যাতে পর্দানসীন হয়ে থাকে, সামাজিকভাবে কোনও সক্রিয় ভূমিকা না নিতে পারে সেই ব্যবস্থা করা। মেয়েদের প্রাণনাশেরও হুমকি দেয়। মহিলাদের সর্বতোভাবে সব অধিকার থেকে বঞ্চিত করাই তালিবান শাসনের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। মানুষকে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা তালিবান জঙ্গিদের অন্যতম কৌশল। ২০০৯ সালে পাক সেনা তালিবানদের হাত থেকে সোয়াট উপত্যকা পুনরুদ্ধার করে ও শান্তি ফিরিয়ে আনে। কিন্তু তাও সময়-বিশেষে তালিবানদের চোখ রাঙানো বন্ধ হয়নি।

কোনও সিনেমা বা গল্পের নায়ক নয়, মালালার চোখে তাঁর বাবাই ছিলেন হিরো। বাবার শিক্ষা এবং নানাবিধ সমাজসেবামূলক কাজ ছোট থেকেই অনুপ্রাণিত করত মালালাকে। জিয়াউদ্দিন মেয়েকে নির্ভীক হতে শিখিয়েছিলেন। শিখিয়েছিলেন নিজের অধিকারের কথা সোচ্চারে উচ্চারণ করতে। ২০০৮-এ যখন তালিবান সোয়াট উপত্যকা দখল করে মালালা তখন ১১। জিয়াউদ্দিন সেইসময় মেয়েকে নিয়ে পেশোয়ার যান একটি স্থানীয় প্রেস ক্লাবের সভায়। মালালা সেখানে জীবনে প্রথমবার বক্তৃতা রাখেন তালিবানদের বিরুদ্ধে। ‘কোন সাহসে তালিবানরা আমাদেরকে আমাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে?’ মালালার এই বক্তৃতা পাকিস্তানের সব জায়গায় সম্প্রচারিত হয়। বিবিসির উর্দু বিভাগ থেকে গুল মাকাইয়ের তত্ত্বাবধানে মালালা নিয়মিত ব্লগ লিখতে শুরু করেন উর্দুতে, যা ‘ডায়েরি অফ আ পাকিস্তানি স্কুলগার্ল’ নামে সাড়া ফেলে। এই লেখায় তিনি সারা পৃথিবীর কাছে তুলে ধরেন নিজের এবং চারপাশের প্রাত্যহিক জীবনের কথা। তালিবানদের নারকীয় কাজকর্ম, পরিস্থিতির শিকার হওয়া সোয়াট উপত্যকা, তাঁর স্কুল যেতে না-পারার হতাশার কথা। লেখাগুলির মধ্যে প্রায় ৩৫টি ইংরেজিতে অনুবাদ হয়। মালালা কখনই অধিকারের জন্য আওয়াজ তুলতে ভয় পাননি। ২০০৯ সালে মালালা প্রথম কোনও পাকিস্তানি টিভি শো-এ সাক্ষাৎকার দেন। পাক সাংবাদিক হামিদ মিরের অনুষ্ঠানে। এবং সেখানে তিনি যথারীতি তালিবানদের বিরুদ্ধে কথা বলেন। হামিদ মীর মালালার মতো ছোট একটি মেয়ের সাহস এবং আত্মবিশ্বাস দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। পাশাপাশি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন তাঁর নিরাপত্তার কথা ভেবে। যেখানে বাঘের ভয়, ঠিক সেখানেই সন্ধ্যা হয়। মালালার এই সোচ্চার হওয়া তালিবানরা ভাল চোখে দেখেনি। অভিজ্ঞ সাংবাদিকের আশঙ্কাই সত্যি হল অবশেষে।

বাকিটা শুনে নিন…

লেখা: মৌমিতা সেন
পাঠ: শঙ্খ বিশ্বাস
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল