গুজরাতের খনিতে ঘোড়া এবং গন্ডারের ‘মিসিং লিংক’

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 5, 2021 4:47 pm|    Updated: April 5, 2021 4:47 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 5, 2021 4:47 pm Updated: April 5, 2021 4:47 pm

গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে গিয়ে চমকে উঠেছিলেন চার্লস ডারউইন। চমকে উঠেছিলেন সেখানকার জীবজন্তুর ধরন দেখে। পাখি আর জন্তুদের বৈচিত্র লক্ষ করে। তাঁর বিবর্তনবাদের শুরু কিন্তু এই সূত্র ধরেই। তাঁর যুক্তি ছিল এক-একটি দ্বীপের স্বতন্ত্র পরিবেশে বিবর্তন ভিন্ন পথে এগয়। দ্বীপ-ভেদে পরিবেশ পাল্টে যায়। পাল্টে যায় বিবর্তনের ধারাও। সৃষ্টিসুখের উল্লাসে প্রকৃতি যে বিভিন্ন প্রজাতির জন্ম দেয়, তার মধ্যেও ভিন্ন পরিবেশের ছোঁয়া লাগে। এভাবেই নতুন নতুন প্রজাতির জন্ম হয়।

সম্প্রতি এক গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে যে ভারতেও সেরকম কিছু ঘটনা ঘটেছিল। প্রশ্ন উঠতে পারে, ভারত তো দ্বীপ নয়! এখন নয় ঠিক! কিন্তু এককালে ছিল। সে আদ্যিকালের কথা। আফ্রিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ভারত ভূখণ্ড যখন ভেলার মতো ভেসে এশিয়ার দিকে এগচ্ছিল, তখন সেটা একটা দ্বীপের মতোই ছিল। ভাসমান দ্বীপ। তার উপরকার জীবজন্তু, গাছপালা সমেত। তারপর আজ থেকে প্রায় পাঁচ কোটি বছর আগে এসে ধাক্কা লাগে এশিয়ার সঙ্গে। তৈরি হয় হিমালয় পর্বতশ্রেণি। আফ্রিকা ঠেকে এশিয়ায় পৌঁছতে সময় লেগেছিল প্রায় পাঁচ কোটি বছর। কারণ তার গতি ছিল মন্থর—বছর মোটে আট ইঞ্চি। এই ভেসে আসার সময় পৃথিবীর অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ভারত ভূখণ্ড বহু নতুন প্রজাতি দেখা দিয়েছিল।

তাদের মধ্যে একটি প্রজাতি থেকেই পরে ঘোড়া এবং গন্ডারের মতো জন্তুর আবির্ভাব হয়েছিল বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। আধুনিক ঘোড়া আর গন্ডার ভিন্ন প্রজাতি। কিন্তু তারা এমন একটি প্রাণীর জীবাশ্ম পেয়েছেন, যেটা ছিল এদের পূর্বপুরুষ। তাকে ‘গন্ডার-ঘোড়া’ বলা যেতে পারে। পোশাকি নাম ‘কাম্বেথেরিয়াম’। কারণ গুজরাতের কাম্বে উপসাগরের কাছে তারকেশ্বরে এই জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছিল প্রায় দশ বছর আগে, সেখানকার একটি পরিত্যক্ত কয়লা (লিগনাইট) খনিতে। প্রাচীন যুগের কাদা জমে গিয়ে হালকা স্লেটের মতো পাথর তৈরি হয়েছে সেখানে। তার পরতে পরতে জীবাশ্মের ছড়াছড়ি। তারই মধ্যে আবিষ্কৃত হয়েছিল এই অদ্ভুত প্রাণীর চিহ্ন।

তখন শোরগোল পড়ে গিয়েছিল বিজ্ঞানী মহলে। এই প্রাণী যে ঘোড়া আর গন্ডারের ‘মিসিং লিংক’ হতে পারে সেই নিয়ে জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছিল। কারণ ঘোড়ার মতো ক্ষুরওয়ালা প্রাণীর উদ্ভব বিজ্ঞানীদের কাছে একটা ধাঁধার মতো ছিল এতদিন। পাঁচ কোটি বছরের বেশি পুরানো এই ধাঁচের কোনও প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া যায়নি। যেন, হঠাৎ করে এদের আবির্ভাব হয়েছিল উত্তর গোলার্ধে। তাই ভাসমান ভারত ভূখণ্ডে এদের পূর্বপুরুষের চিহ্ন আবিষ্কার করার পর এই ধাঁধার উত্তর পাওয়া গেল বলে অনেকে ভেবেছিলেন। তাছাড়া এই নিয়ে একটা অনুমানও ছিল। আমেরিকার স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক ডেভিড ক্রাউজ এবং মেরি মাস ১৯৯০ সালে বলেছিলেন, জেব্রা এবং ঘোড়ার মতো ক্ষুরওয়ালা জন্তুদের আবির্ভাব হয়তো ভারতেই হয়েছিল, যখন সেটি ভেসে আসছিল এশিয়ার দিকে। একসময় ভারতের নৌকা এসে এশিয়ায় ডাঙায় ভিড়লে পরে তারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

তখন থেকেই এই অনুমাসের যথার্থতা যাচাই করার জন্য সেই প্রকল্পিত প্রাণীর জীবাশ্মের তল্লাশি করতে বিজ্ঞানীরা এসেছেন ভারতে। আমেরিকার জন্ হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেনেথ রোজ-এর নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল গবেষণা। খরচ জুগিয়েছিল ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি’। কাজটি মোটেই সহজ ছিল না। অনেক সময় বিজ্ঞানীরা কয়েকশো ফুট গভীরে খনির একেবারে নিচের অংশে গিয়ে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ধৈর্য ধরে জীবাশ্ম জোগাড় করেছেন। শুধু কি দমবন্ধ করা গরম? খনিতে মজুরদের কোদালের খুটখাট আওয়াজ চলছিল অনবরত।

তারপর? শুনুন…

লেখা: বিমান নাথ
পাঠ: কোরক সামন্ত
আবহ: শুভাশিস চক্রবর্তী

পোল