চিনের অধ্যাপক ও মানবাধিকার কর্মী লিউ শিয়াবাও-এর নোবেল প্রাপ্তি ও একটি ফাঁকা চেয়ারের কাহিনি

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 28, 2021 5:31 pm|    Updated: April 29, 2021 3:31 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 28, 2021 5:31 pm Updated: April 29, 2021 3:31 pm

১৯৯৬। লিউ-কে পাঠানো হয় এক শ্রমশিবিরে, তারপর আবার কারাবাস। ১৯৮৯—৯১, ১৯৯৫—৯৬, ১৯৯৬—৯৯, ২০০৮ ও ২০০৯—জীবনের এতগুলি বছর কেবল জেলের অন্ধকারে কেটেছিল তাঁর জীবন। ১৯৯৫ সালের ১৮ই মে, তিয়েনআনমেন বিক্ষোভের ষষ্ঠ বার্ষিকী উপলক্ষে একটি পিটিশন প্রচারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সেই সময় চিন সরকারের পুলিশ আবার লিউকে হেফাজতে নেয়। বেজিংয়ের শহরতলিতে ন’মাস ধরে তাঁকে রাখা হয়, আবাসিক নজরদারিতে। ১৯৯৬-র ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পেলেও তা ছিল খুবই সাময়িক। ‘দশম ঘোষণাপত্র’ লেখার অপরাধে আবার গ্রেপ্তার হন ৮ই অক্টোবর। ১৯৯২ সালে তাইওয়ানের কারাগারে বন্দিশিবিরে বন্দিদশার প্রথম বই প্রকাশ করেছিলেন লিউ, ‘The Monologues of a Doomsday’s Survivor’

২০০৩ সাল। বাড়িতে চিন সম্পর্কে মানবাধিকার রিপোর্ট লেখায় ব্যস্ত লিউ-এর বাড়ি থেকে হঠাৎই বাজেয়াপ্ত হল কম্পিউটার, চিঠি, সরকারি নথিসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ!

বন্দিত্বের কঠিনতম অবস্থাতেও নিজের অবস্থান থেকে একটুও সরে আসেননি লিউ! ২০০৯ সালের ১লা ডিসেম্বর বেইজিং পুলিশ, তদন্ত ও প্রসেসিংয়ের জন্য লিউ-এর কেস ক্রয়রেটরে স্থানান্তরিত করে। ১০ই ডিসেম্বর, সরকারিভাবে লিউকে “রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধীনতা প্ররোচিত করার” অভিযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয় এবং তার আইনজীবী শ্যাং বাজুন এবং ডিং জিকুইকে প্রেরণ করেন, অভিযোগের নথি। ২০০৯ সালের ২৩শে ডিসেম্বর তাঁকে বেইজিং নং—১ এর মধ্যবর্তী আদালতে বিচার করা হয়েছিল। তাঁর শ্যালক উপস্থিত থাকলেও তাঁর স্ত্রীকে শুনানির সময়ে উপস্থিতির অনুমতি দেওয়া হয়নি! আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড সহ এক ডজনেরও বেশি দেশের কূটনীতিকদের বিচার দেখার জন্য আদালতে প্রবেশের সুযোগও অস্বীকার করা হয়েছিল এবং তাঁরা সকলেই তাঁর মেয়াদের জন্য আদালতের বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন! এঁদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন দূতাবাসের রাজনৈতিক কর্মকর্তা গ্রেগরি মে এবং সুইডিশ দূতাবাসের সচিব নিকোলাস উইকস। ২০০৯ সালে রাষ্ট্রের তরফ থেকে আসে চরম আঘাত। চিন সরকার ঘোষণা করেন, আমৃত্যু কারাবাস করতে হবে লিউ শিয়াবাওকে। কারাগারের বাইরে বেরোলে তিনি নাকি রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যকলাপে নিযুক্ত হতে পারেন! তৎকালীন পৃথিবীর বৃহত্তম কমিউনিস্ট দেশটির এমন দৃষ্টান্তমূলক নিদানের কি বিশেষ কোনো কারণ ছিল? কারাবাস থেকে যে সামান্য সময়ের জন্য শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেয়েছিলেন লিউ, সেই সময়ে তিয়েনআনমেনের ঘটনার প্রতিবাদে শুরু করেছিলেন গণস্বাক্ষর সংগ্রহ। ৩০৩ থেকে স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮৬০০-তে! সরকারি কর্মচারী, আইনজীবী, লেখক, শিক্ষাবিদসহ দেশের তাবড় মানুষেরা ছিলেন সেই স্বাক্ষরকারীদের তালিকায়! তাহলেই বুঝুন, এত বড় অপরাধ আর ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার’ ফতোয়া জারি করা হবে না, তাও কি হয়?

২০১০ সাল। ইতিহাসের মানচিত্রে স্মরণীয় আরেকটি বছর। দীর্ঘ জীবনে মানবাধিকার সংক্রান্ত লড়াইয়ের কারণে লিউ শিয়াবাও’কে নোবেল শান্তি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। কারাগারে অবস্থানকারী এক বন্দিদশার মধ্যে নোবেল প্রাপ্তির এমন ঘটনা পৃথিবীতে বিরল। তাঁর আগে ঠিক এমনভাবেই নাৎসিজমের বিপক্ষে বিরুদ্ধাচরণ করে কারাবাস হয়েছিল কার্ল ভন ওসিয়েটজকির। নোবেল কমিটি তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তির কারণ হিসেবে লেখেন, “for his long and non-violent struggle for fundamental human rights in China” । এই ঘোষণা শুনে লিউ জেলের ঠাণ্ডা অন্ধকারে বসে নীরবে কেঁদেছিলেন, বলেছিলেন, এই পুরস্কার উৎসর্গ করছি তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের মৃত উজ্জ্বল ছেলেমেয়েদের মাকে। যারা সব হারিয়েছেন।

সময় বদলালেও শাসকের অবস্থানের বিশেষ বদল ঘটেনি বোধহয়।

এই খবর প্রকাশে চিনে প্রবল বাঁধার মুখে পড়তে হয় বিদেশী মিডিয়াগুলোকেও। চিনের সমর্থনকারী অন্তত পনেরটি দেশ এই পুরস্কারের বিরোধিতা করে। এবং অনুষ্ঠানে যেতে অস্বীকার করে। লিউ-এর স্ত্রী লিউ শিয়াকে এই ঘটনার প্রেক্ষিতে যাতে কোনও বিবৃতি দিতে না পারেন, তাই তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়।

তারপর? শুনুন…

লেখা: বিতান দে
পাঠ: শঙ্খ বিশ্বাস
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল