কেউ বলতেন নার্সিসিস্ট, কেউ বলতেন ভাঁড়, বিশ্বের অন্যতম সেরা পদার্থবিদ নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যানের জীবনের টুকরো গল্প

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 10, 2021 11:15 pm|    Updated: April 10, 2021 11:19 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 10, 2021 11:15 pm Updated: April 10, 2021 11:19 pm

নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি-তে আয়োজিত ম্যাথ চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম হয়েছিলেন রিচার্ড ফাইনম্যান। ধারে কাছে ছিল না কেউ। এহেন জিনিয়াসের আইকিউ ছিল মাত্র ১২৫। যা কিনা তাঁর ছোট বোনের থেকেও কম। ভাবা যায়?

কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি’তে গণিত নিয়ে পড়তে চাইলেন। কিন্তু বাঁধ সাধলো জাত! ইহুদিদের কোটা সম্পূর্ন হয়ে যাওয়ায়, সুযোগ পেলেন না। এলেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’তে। কিন্তু এবার শুরু হলো অন্য সমস্যা! গণিত বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শুরু করলেন কিন্তু বেশিদিন সেই সুখ স্থায়ী হল না। সাধের গণিতই তাঁর কাছে বড্ড অবাস্তব এবং অপ্রযোজ্য বলে মনে হতে শুরু করল। তাই বিষয় বদলে পড়তে শুরু করলেন, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। কিন্তু সেখানেও সমস্যা। তার মনে হতে থাকল, তিনি যা চাইছেন তা তিনি কিছুতেই পাচ্ছেন না! অবশেষে তাঁর তরী ঘুরল এবং এসে পৌঁছল পদার্থবিদ্যার বন্দরে। অবশেষে তিনি পড়াশোনায় জ্ঞানের স্বাদ আর অফুরান মজা খুজে পেলেন; এবং হয়ে উঠলেন, পৃথিবীর বুকে এক সুপরিচিত প্রাণ! ‘পড়াশোনার বিষয় সেটাই বাছাই করা উচিত যেখানে শুধু মস্তিষ্ক নয় হৃদয়েরও টান থাকা উচিৎ’, ফাইনম্যান সে বিষয়ে এক আদর্শ উদাহরণ।

তিনি বলতেন, ‘ইটস নেভার টু লেট টু ফলো ইওর ড্রিম।’ মৃত্যুর পরবর্তী একশ বছরেও তাঁর জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র  কমেনি, এর কারণ কিন্তু শুধু ফিজিক্স নয়। তিনি একধারে বিজ্ঞান-পিপাসু হলেও অন্যদিকে ছিলেন দাপুটে প্রেমিক এবং তার চেয়েও একজন হাসিখুশি হালকা মনের মানুষ।

ছেলেবেলার বান্ধবী আর্লিন গ্রিনবামকে তিনি পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর জীবনের সব থেকে বড় অধ্যায় ছিল যখন ‘ম্যানহাটান প্রজেক্ট’-এ রবার্ট ওপেনহাইমার তাঁকে বেছে নিলেন। যুবক ফাইনম্যান লস আলামস শহরে এই প্রজেক্ট-এর কাজের সময়ে সবাইকে একাই মাতিয়ে রাখতেন ঠাট্টা, ইয়ার্কি, মজা দিয়ে। তাতে কখনও বিজ্ঞানীরা সারাদিনের অযুত ক্লান্তিকর গবেষণার পরিশ্রমের মাঝে পেতেন একটু ফুরফুরে ভাব, একটু হাল্কা হওয়ার স্বাদ। আবার কখনও তাঁরা এত মজা ঠাট্টার বহরে কাজে মনযোগের ব্যাঘাত হচ্ছে বলে ক্ষেপে লাল হয়ে যেতেন! তাঁর ক্ষুরধার বাচনভঙ্গি আর লোক হাসানোর ক্ষমতা তাঁকে সব পার্টি-মিটিং-এ মধ্যমণি করে রাখার জন্য ছিলেন যথেষ্ট। তাই বিদ্বেষীদের কাছে অচিরেই পেলেন ‘ভাঁড়’-এর পরিচিতি। দীর্ঘদিন কাজের শেষে হঠাৎ হঠাৎই তিনি বেরিয়ে পড়তেন তাঁর সাধের ডজ ট্রেডসমান মাক্সিভ্যান নিয়ে লং রাইডে। এই গাড়ির গায়ে আঁকা ছিল বিখ্যাত ‘ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম’।

ফাইনম্যান-এর কাজের মুখ্য বিষয় ছিল কোয়ান্টাম মেকানিক্স। কোয়ান্টাম স্তরে অণু-পরমাণু’র আচরণ তাঁর রাফ ড্রইং-কপি’তে, তিনি এঁকেছিলেন। যা অচিরেই বিখ্যাত হয়ে ওঠে। ‘ম্যানহাটান প্রজেক্ট’-এ তাবড় তাবড় সব বিজ্ঞানী যেমন আইনস্টাইন, উল্ফগ্যাং পাউলি, রাদারফোর্ড, ওপেনহাইমার—এঁদের সান্নিধ্য তাঁকে আরও পরিপুষ্ট করেছিল। সেখানেই কিছু যুবক বিজ্ঞানী হয়ে ওঠেন, তাঁর খুব কাছের বন্ধু। তাঁর মধ্যে অন্যতম ছিলেন পাউলি এবং ক্লাউস ফুক্স, সারা দুনিয়া যাকে চেনে ‘বিশ্বাসঘাতক’ নামে! এই ফুক্স পরমাণু বোমার নক্সা লুকিয়ে পাচার করেছিলেন রাশিয়ায়।

পরমাণু বোমার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের সময় ফাইনম্যানের স্ত্রী আর্লিন অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফুক্স এই পরীক্ষামূলক গবেষণার মাঝপাথে, ফাইনম্যানকে তাঁর স্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়না, মারা যান আর্লিন। তীব্র শোকে ছারখার হয়ে যান ফাইনম্যান।

জীবনের তাঁর দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়। তিনি কঠোর থেকে কঠোরতর বিজ্ঞান সাধনায় মনোনিবেশ করলেন।

শুনুন…

লেখা: অনীশ ভট্টাচার্য
পাঠ: শঙ্খ বিশ্বাস
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল