কেন্দ্রীয় বাজেটে স্পিরিচুয়াল ট্যুরিজমে জোর দিয়েছে মোদি সরকার। আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বেশকিছু তীর্থস্থানের উন্নতিতে। পর্যটক টানতে বিভিন্ন ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাতে লাভের লাভ হচ্ছে বইকি। ঠিক কী জানাচ্ছে এই সংক্রান্ত সাম্প্রতিক সমীক্ষা? আসুন শুনে নেওয়া যাক।
চলতি বছরের শুরুতেই ছিল মহাকুম্ভ। সেই নিয়ে বিস্তর হইচই চলেছে দেশজুড়ে। বিষয়টা চর্চার কেন্দ্রে উঠে আসার বড় একটা কারণ ছিল সোশাল মিডিয়া। রিলের দাপটে অন্য কিছু নিয়ে মাথা ঘামানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। রিল বা ভিডিওর নেপথ্যে যারা ছিলেন, তাঁদের বয়স খুব একটা বেশি নয়। তরুণ প্রজন্ম বলাই যায়। প্রশ্ন হচ্ছে কুম্ভমেলার মতো ধর্মীয় জমায়েতে দেশের এত তরুণ-তরুণী ভিড় জমিয়েছিল (Spiritual Tourism) কীসের টানে?
ধরে নেওয়া যাক, প্রচার দেখে মনে আগ্রহ জন্মেছিল। যেভাবে যোগীরাজ্যের সরকার এই মেলার ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরেছিল তাতে আগ্রহ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্রেফ কুম্ভমেলাতেই কি দেশের তরুণ প্রজন্ম ভিড় জমিয়েছে? উত্তরটা সোশাল মিডিয়ায় চোখ রাখলে বোঝা যাবে। চারধাম যাত্রা থেকে বেনারস, পুরী, তিরুপতি এমনকি খুব একটা পরিচিত নয় এমন মন্দিরেও ভিড় জমাচ্ছেন (Spiritual Tourism) এঁরা। সেইসব জায়গা ঘুরে ভিডিও বানাচ্ছেন। কেউ কেউ সেই জায়গার ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করছেন। অন্যদের সেখানে আসার জন্য উৎসাহও যোগাচ্ছেন। স্রেফ ধরণটা আলাদা। বেশিরভাগই ধর্মীয় গুরুত্বকে তেমন আমল দিচ্ছেন না। বরং সেই জায়গার আকর্ষণ ঠিক কী, সেটা স্পষ্ট করছেন।
চারধাম যাত্রার কথাই ধরা যাক। এক্ষেত্রে আকর্ষণ যাত্রাপথ। দুর্গম, কিন্তু রোমাঞ্চের। সেই রোমাঞ্চ উপভোগ করতেই শামিল হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। কেদার মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে জীবনকে উপলব্ধি করছেন অনেকে। অন্তত তাঁদের সোশাল মিডিয়া পোস্ট সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। রামমন্দিরের কথাও বাদ রাখা যায় না। প্রতিষ্ঠার পর থেকে রেকর্ড ভিড় হচ্ছে অযোধ্যার মন্দিরে। সেখানেও তরুণরা সংখ্যায় অনেক বেশি। বলাই বাহুল্য, রামের মাহাত্ম্য খুঁজতে বা পুজো দিতে সবাই যাচ্ছেন না। বরং মন্দির তৈরি যে বিতর্কিত অধ্যায়, তা চোখের সামনে দেখতে চাইছেন অনেকে। সেখানকার সংস্কৃতি, রামের প্রতি অযোধ্যার মানুষের বিশ্বাস, সবকিছু বুঝতে চাইছেন তাঁরা। বেনারসের কথাও এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে। এমনিতে কাশী বড় সুন্দর এক শহর। অলিতে গলিতে ছড়িয়ে ইতিহাস। বিশ্বনাথ মন্দিরের জন্য তো বটেই, একইসঙ্গে গঙ্গারতি কিংবা বেনারসের অন্যান্য মন্দিরগুলো ঘুরে দেখতে চাইছেন অনেকে(Spiritual Tourism)। ক্যামেরাবন্দি করছেন প্রাচীন শহরে ছড়িয়ে থাকা মুহূর্তগুলোকে। সেইসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া তো রয়েছেই। জীভে জল আনা সব খাবারের খনি এই বেনারস। সেসব জমিয়ে উপভোগ করছেন দেশের তরুণ প্রজন্ম। দক্ষিণের গল্পটাও প্রায় এক। এখানে অবশ্য আচার-নিয়মের কড়াকড়ি একটু বেশি। তাতেও আপত্তি নেই কারও। রীতি মেনেই সেখানকার মন্দিরে ঘুরে আসছেন তরুণরা। কেউ কেউ বিষয়টাকে কৃত্বিতের মতো দেখছেন। মানে অমুক মন্দিরে ঘুরে আসাটা বিশেষ অ্যাচিভমেন্ট।
এ বিষয়টা অবশ্য দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শণের ক্ষেত্রেও বলা যায়। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা বিশেষ শিবমন্দিরগুলি একবারে ঘুরে আসার ছক কষছেন কেউ কেউ। তা সফল হলে ঘটা করে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করছেন। তাতে লাইকের বন্যা ভেসে যাচ্ছে। সুতরাং তরুণ প্রজন্মের এই আচরণ বাকিরাও যে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন না এমনটা বলাই যায়। সমীক্ষা বলছে দেশজুড়ে তীর্থভ্রমণের প্রবণতা (Spiritual Tourism) চলতি বছরে প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। এই দলে তরুণ প্রজন্ম যে বড় সংখ্যায় রয়েছে তা বলাই যায়। বয়স বাড়লে তবেই তীর্থভ্রমণ, এই ধারণা যেন বদলাচ্ছে। বরং তীর্থস্থান যেখানে অবস্থিত, সেই জায়গার গুরুত্ব বেশি করে বুঝতে চাইছেন তরুণরা। একটা বয়সের পর দুর্গম স্থানে তীর্থ করতে যাওয়া সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে অনেক কিছুই অদেখা থেকে যেতে পারে। তাই আগেভাগে সেইসব কঠিন পথ পেরিয়ে মন্দির ঘুরে আসছেন তরুণরা। গন্তব্য হয়তো ধর্মস্থানে গিয়ে থেমেছে, কিন্তু সেখানে পৌঁছতে যে পথ পেরোতে হল, তা অন্যরকম রোমাঞ্চ দিয়েছে বইকি।
এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় জনপ্রিয় হোটেল বুকিং সংস্থা ওয়োর কথা। সম্প্রতি তারাও নিজেদের রিব্র্যান্ডিং করেছে। এতদিনে যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে তা ধীরে ধীরে বদলাতে চেয়েছেন সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা। জানা যাচ্ছে, যাঁরা এই সংস্থার পার্টনার হোটেল ব্যবহার করেন, তাঁদের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই পরিবারের লোকজন, নয় ব্যবসায়ী। সেই জায়গা থেকেই এই কৌশলগত পরিবর্তন। আসলে অনলাইন ট্রাভেল বুকিং প্ল্যাটফর্ম। তবে কাপল-ফ্রেন্ডলি হিসাবেই সুনাম ছিল ‘ওয়ো’-র। যাকে বদনাম বললেও ভুল হত না। নতুন নিয়মে, নিজেদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ডলি করতে চেয়েছে সংস্থা। আর তাই, অযোধ্যা-পুরীর মতো ধর্মীয় স্থানে ৫০০-রও বেশি নতুন হোটেল খোলার পরিকল্পনা করেছে তারা। মোটের উপর এই বিষয়টা থেকেই আরও স্পষ্ট হয় স্পিরিচুয়াল ট্যুরিজমের (Spiritual Tourism) বর্তমান পরিস্থিতিটা। তরুণ প্রজন্ম ধর্মস্থানে যাবে, এবং সেখানে থাকার জায়গা খুঁজবে, তাতে ওয়োর নাম সবার আগে মনে আসবে অনেকের, এমনটা যেন আগেভাগেই বুঝে নিয়েছে সংস্থা। সমীক্ষা থেকে আরও জানা যায়, অন্তত ৬-৭ দিন তীর্থস্থানে কাটিয়ে আসছেন অনেকে। তাতে বোঝা যায় স্রেফ কৌতূহল মেটাতে তীর্থভ্রমণ নয়, ভালোভাবে সেই জায়গা বোঝার জন্যই ব্যাগ গোছাচ্ছেন অনেকে।