তেজস্ক্রিয়তার অভিশাপে ছারখার হয়ে যাওয়া চেরনোবিলের ইতিবৃত্ত, সাড়ে তিন দশক পর সেই পারমাণবিক বিপর্যয়কে ফিরে দেখা

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 27, 2021 2:47 pm|    Updated: April 27, 2021 3:07 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 27, 2021 2:47 pm Updated: April 27, 2021 3:07 pm

২৮শে এপ্রিল সরকারি তরফে ঘটনার একটা বিবৃতি এল। সারা দুনিয়া বুঝল এক ঐতিহাসিক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে চেরনোবিল। তাদের ১৯০ মেট্রিক টন ইউরেনিয়াম এর প্রায় ৩০ শতাংশ ভাসছে বাতাসে। সোভিয়েত সরকার প্রায় ৩ লক্ষ ৩৫ হাজার মানুষকে স্থানান্তরিত করেছে। আর সেই বিস্ফোরিত টাওয়ার ঘিরে ১৯ মাইল ব্যাসার্ধের একটি ‘এক্সক্লুসন জোন’ বানিয়েছে। ঘটনাটি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ যায় ২৮ জনের। একশোরও বেশী আহত হন। ‘ইউনাইটেড নেশনস’-এর সায়েন্টিফিক কমিটির তরফে জানানো হয় প্রায় ছয় হাজারেরও বেশী শিশু আর কিশোর-কিশোরীর তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে ‘থাইরয়েড ক্যান্সার’-এ আক্রান্ত হয়। যদিও রাশিয়ার সরকার এই তথ্যের বিরোধিতা করেছিল। ২০০৫ সালে একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়, আন্তর্জাতিক গবেষকদের মতে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার বিকিরণে অন্তত ৪০০০ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল।

গবেষক-বিজ্ঞানী কেট ব্রাউনের মতে ভয়ঙ্কর এই দুর্ঘটনার ছায়া ছিল সুদূরপ্রসারী। ইউক্রেন-বেলারুশ-রাশিয়া’র আরও কিছু ছোট ছোট এলাকায় স্থান পেয়েছিল ঘরছাড়া মানুষগুলি। সরকারি তরফে তাদের মিলেছিল ‘লিকুইডেটর’-এর আখ্যা। তাদের ইন্টারভিউ নিয়েই এবং হসপিটালের রেকর্ড চেক করে আড়াল করে রাখা এই দুর্ঘটনার পর্দা উন্মোচন করেন ব্রাউন। হাজার হাজার জীবজন্তু মারা যায় এলাকা উদ্বাসনের সময়। সাধারণ মানুষ যাঁরা ভেড়ার উল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত তাঁরা জানতেনই না যে শরীরে কী পরিমাণ বিষ তারা বহন করে চলেছেন। কারওর চুল উঠে চলেছে, কারওর দেহের কিছু অংশের বিকৃতি ঘটছে ধীরে ধীরে। বিস্ফোরণের প্রায় মাস খানেক হাজার হাজার দমকলকর্মী, ইঞ্জিনিয়ার, সেনাবাহিনী, পুলিশ, খননকারি, ডাক্তার অক্লান্ত পরিশ্রমে চেরনোবিলের উদ্ভূত অবস্থা শান্ত করেন। তাঁদেরকেও দেওয়া হয় ‘লিকুইডেটর’-এর তকমা। তাঁদের জন্যে বরাদ্দ হয় অতিরিক্ত  অর্থ এবং স্বাস্থ্যবীমা পরিষেবা। ‘রাশিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’-এর তরফে জানানো হয় প্রায় ৮ লক্ষ ৩৫ হাজার মানুষ নিযুক্ত হয়েছিলেন পরিষেবায়। যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ ২০০৫ সালের মধ্যেই মারা যান। প্রতি হাজারে অন্তত তিনজন মানুষ তেজস্ক্রিয় বিকরণে মারা যাচ্ছিলেন। ১৯৮৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে প্রতি হাজারে মৃতের সংখ্যা সাড়ে তিন থেকে বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে সতেরোতে। প্রিপ্যাট এর কিছু ‘লিকুইডেটার’-এর থাইরয়েড গ্ল্যান্ড মিলেছে ৩.৯ গ্রে-বিকিরণ যা এক্সরের প্রায় ৩৭০০০ গুণ শক্তিশালী। আজও চেরনোবিলে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে স্টিলের বিশাল বিশাল পরিত্যক্ত চিমনি। ২০১৬ সালে অবশ্য কিছু কাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। পরিষ্কারের কাজ এখনও চলছে। চলবে প্রায় ২০৬৫ সাল পর্যন্ত। চারবর্গ কিলোমিটার ব্যপ্ত একটি ঘন জঙ্গল তেজস্ক্রিয়তার সম্পূর্ণ লাল হয়ে গেছিল। সেই জঙ্গল ‘রেড ফরেস্ট’ নামে পরিচিত। সেই এক্সক্লুসন জোন ভূতুড়ে জঙ্গলের মত, আজ অদ্ভুত ভাবে নিশ্চুপ। যদি আজও প্রাণের সঞ্চার ঘটছে। তবে বেশীরভাগই বিকৃত। মানুষের উৎপাত কমার ফলে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায় জংলি কুকর, নেকড়ে, হরিণ আর বিড়াল।

মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনাগুলি’র মধ্যে ভয়ংকরতম উদাহরণ চেরনোবিল। সব ঘটনারই খারাপ ভালো সবরকমের প্রভাব থাকে। তাই কিছু ভালো প্রভাব হয়তো এরও ছিল। রাশিয়ার এই সেমসাইড জেনোসাইড পৃথিবীর অন্যান্য পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকে সতর্কতার পাঠ শেখায়। রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক চাপে পতন ঘটে ইউএসএসআর-এর। বিশ্বজুড়ে শুরু হয় ‘পরমাণু শক্তি বিরোধী আন্দোলন’। ২৩৫ বিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে রাশিয়ার সরকার। এখনকার বেলারুশের প্রায় ২৩ শতাংশ চাষযোগ্য জমি তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে নষ্ট হয়ে যায়। ১৯৯১-এ বেলারুশ সরকারের বাজেট এর ২২ শতাংশ বরাদ্দ ছিল চেরনোবিল-এর অবস্থা উন্নতির জন্য।

শুনুন…

লেখা: অনীশ ভট্টাচার্য
পাঠ: শঙ্খ বিশ্বাস
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল