জাপানি বিজ্ঞানীদের অধ্যাবসায়ে অসাধ্য সাধন, গ্রহাণুর ধুলোয় প্রাণের সন্ধান

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 6, 2021 4:30 pm|    Updated: April 6, 2021 6:17 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 6, 2021 4:30 pm Updated: April 6, 2021 6:17 pm

বহুদিন ধরেই এই প্রশ্নটা বিজ্ঞানীদের মাথায় ঘুরছে। তর্কও চলছে। পৃথিবীতে প্রাণ কী করে এল—এই প্রশ্নের মাোকাবিলায় একাধিক দলে বিভক্ত বিজ্ঞানী মহল। কারও মতে, পৃথিবীর আদিম পরিবেশেই জড় পদার্থ থেকে প্রথম জৈব অণু তৈরি হয়েছিল, কিছু বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়। অন্য দল এতে প্রশ্ন রাখেন—প্রাণের দরকারি কিছু জৈব অণু মহাকাশ থেকে টপকে পড়েনি তো? যেমন, ধূমকেতু বা গ্রহাণুর সঙ্গে, কারণ এগুলাো পৃথিবীর জন্মের সময় থেকেই সৌরমণ্ডলে রয়েছে। এর উত্তরে প্রথম দল বলেন, দরকার কীসের? এখানেই তো সব রয়েছে। অন্য দলের বিজ্ঞানীরাও ছাড়ার পাত্র নন। তাদের বক্তব্য, প্রয়াোজন-অপ্রয়াোজনের কথা নয়, যদি এসেই থাকে তাহলে সেকথা স্বীকার করতে বাধা কীসের? এ যেন বাড়ির লোক বলছে—ঘরে রান্না হয়েছে, আর অন্যদের প্রশ্ন, বাইরের খাবারে কীসের আপত্তি!

এই নিয়ে জবর গবেষণা চলছে আজকাল। কারণ, কয়েকটি ধূমকেতুর লেজে বেশ কিছু জৈব অণুর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। যেমন, গ্লাইসিনের মতাো অ্যামাইনো অ্যাসিড। আর আমরা জানি যে হরেকরকম অ্যামাইনো অ্যাসিড দিয়েই তৈরি হয় প্রাোটিন। এবং জীবদেহে প্রাোটিন অপরিহার্য। তাই এমনটা হতেই পারে যে ধূমকেতুর পিঠে করে কিছু মহাজাগতিক জৈব অণু পৃথিবীতে এসেছিল।

গ্রহাণুর উপকরণ নিয়েও একই প্রশ্ন উঠেছে, তবে সেই গবেষণা সহজ নয়। ধূমকেতুর লেজে গ্যাস থেকে বিচ্ছুরিত আলাো পরীক্ষা করে তার উপকরণ সম্বন্ধে আন্দাজ করা যায়, পাথুরে গ্রহাণুর ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়। একমাত্র উপায় হল তাকে হাতেনাতে ধরা।

মনে হতে পারে, এটা তো সহজ কাজ। উল্কাপিণ্ড পরীক্ষা করে দেখলেই হল! উল্কা তাো আসলে পৃথিবীর মহাকর্ষের বিপদসীমা অতিক্রম করে ফেলা গ্রহাণু। ঠিক কথা। এবং সেরকম কিছু উল্কাপিণ্ডর মধ্যে বিভিন্ন জৈব অণু পেয়ে বিজ্ঞানীরা তাজ্জব বনে গিয়েছেন। যেমন, ১৯৬৯ সালে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার মার্কিন অঞ্চলে এসে পড়া একটি উল্কাপিণ্ড। এই ‘মার্চিসন’ উল্কাপিণ্ডে প্রায় ৭০ রকমের অ্যামাইনো অ্যাসিড পাওয়া গিয়েছে। এদের মধ্যে আটখানা রয়েছে, যেগুলাো পৃথিবীর জীবজগতে প্রাোটিন তৈরি করার কাজে লাগে! বিজ্ঞানীদের আহ্লাদে আটখানা হওয়ার খবর ঠিকই। কিন্তু সঙ্গে প্রশ্নও জাগে, উল্কাটির সঙ্গে এই অণুগুলাোর সম্পর্ক নিয়ে। কোথা থেকে অণুগুলাো এসেছে! পৃথিবীতে হুমড়ি খেয়ে পড়ার আগেই ছিল, না কি এখানে মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় পৃথিবীর পরিবেশের জৈব ছোঁয়া লেগেছিল? একই ফল পাওয়া গিয়েছিল কানাডার এক উল্কাপিণ্ড থেকে। ২০০০ সালে ট্যাগিশ হ্রদে এসে পড়েছিল এটি। সেবার অবশ্য বিজ্ঞানীরা দেরি করেননি। সেদিনই উল্কাপিণ্ডর টুকরোগুলোকে জোগাড় করে এমনভাবে রেখেছিলেন যাতে গবেষণাগারের বাইরের পরিবেশ তাদের কলুষিত না করতে পারে। সেখানেও তারা অ্যামাইনো অ্যাসিড পেয়েছিলেন, যেগুলোর বৈচিত্র বেশ অবাক করে দেওয়ার মতো। উল্কাপিণ্ডর পাথরের মধ্যে পেয়েছিলেন জলের চিহ্ন!

তবে খুঁতখুঁত থেকেই যায়। হোক না কয়েক ঘণ্টার ব্যবধান। তবু উল্কাপতন আর গবেষণাগারের বয়ামে রাখার মধ্যে ওই সময়টুকুর মধ্যেও তো উল্কাপিণ্ডর গায়ে জৈব-দূষণ হতে পারে। বিজ্ঞানীদের শুচিবাই হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু কণামাত্র সন্দেহ থাকলেও কোনও সম্ভাবনাকে নাকচ করা যায় না। আর গ্রহাণুর ক্ষেত্রে পার্থিব-দূষণের সন্দেহ দূর করা অসম্ভব, যদি না মহাকাশযান পাঠিয়ে গ্রহাণুর গায়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে সিল করা বয়ামে ভরে নমুনা নিয়ে আসা যায়।

ঠিক এই প্রায়-অসাধ্য সাধন করেছেন জাপানি বিজ্ঞানীরা। চাদের মতো উপগ্রহের উপর মহাকাশযান নামানো যে কী কঠিন, সেটা ভারতের ‘চন্দ্রযান ২’-এর সময় আমরা বুঝতে পেরেছি। তার তুলনায় ছোট একটি বস্তুর উপর নিখুঁতভাবে অবতরণ করা আরও কঠিন।

আরও একটা ব্যাপারে জাপানি বিজ্ঞানীদের কুর্নিশ জানাতেই হয়। দশকের পর দশক ধরে কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে, অন্য দেশ চাদে গেল না মঙ্গলে গেল সেই প্রতিযোগিতায় না নেমে, এক লক্ষ্যে স্থির থেকে তপস্যার মতো গবেষণা করে চলেছেন—কীভাবে গ্রহাণু থেকে নমুনা আনা যায় পৃথিবীতে। এটি সত্যি শিক্ষণীয় ব্যাপার। কারণ, এই গবেষণায় অনেকবার বাধা এসেছে। এসেছে ব্যর্থতা। কিন্তু তারা ভেঙে পড়েননি। কতখানি আত্মপ্রত্যয় থাকলে একটি দেশের বিজ্ঞানীরা এইভাবে আত্মময় হয়ে কাজ করতে পারেন, আর সেই দেশের ছাত্ররা এই উদাহরণ থেকে আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পারে, ভাবলেই মাথা নুয়ে আসে শ্রদ্ধা।

তারপর? শুনুন…

লেখা: বিমান নাথ
পাঠ: কোরক সামন্ত
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল