তিন মহাদেশের মানুষের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ‘বাঁধ ভাঙার গান’ হয়েছিল বিঠোফেনের নাইন্থ সিম্ফনি

Published by: Sankha Biswas |    Posted: May 12, 2021 10:13 pm|    Updated: May 13, 2021 2:15 am

Published by: Sankha Biswas Posted: May 12, 2021 10:13 pm Updated: May 13, 2021 2:15 am

১৯৮৯ সালের শেষের দিকে, পৃথিবীর তিন প্রান্তের তিন দেশের মানুষ স্বৈরাচারের বিরূদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন। আমরা অবশ্য বলব জার্মানির কথা, চিন এবং লাতিন আমেরিকার ছোট্ট দেশ চিলির কথা। তিন প্রান্তের তিন দেশ, আলাদা ভূগোল, আলাদা ভাষা—কিন্তু সবারই অভিজ্ঞতা একই, ভয়ংকর স্বৈরতন্ত্রের। কোথাও বামপন্থী কমিউনিস্ট স্বৈরতন্ত্র, কোথায় তীব্র ডানপন্থী মিলিটারি স্বৈরতন্ত্র। শোষন করার বেলায় পতাকার রঙের পার্থক্য বিশেষ থাকে না।

মানুষকে যতই চেপে পিষে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়, ততই সে গণ প্রতিরোধ করে, আটকে দিতে চায় শোষণ—বধ্যভূমিতেই লিখতে চায় কবিতা। প্রাচীন গ্রীক নাটক, ‘আন্তিগোনে’র এক বিখ্যাত সংলাপ আমাদের মনে পড়তে পারে, ‘তুমি যত জোরেই হাত মোচড়াও না কেন ক্রেয়ন, আমার আর ব্যথা লাগছে না’!

এই চিরন্তর প্রতিরোধের মহাকাব্যে, সারাবিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন—তখন তার মতো কবিতার সঙ্গে যদি ছুঁয়ে থাকে বিঠোফেনের ‘নাইন্থ সিম্ফনি’র সুর, তখন দুই কবিতা একত্রে কী নতুন মহাকাব্যে রূপান্তরিত হয়ে যায় না?

‘Following the Ninth: In the Footsteps of Beethoven’s Final Symphony’ নামের এক তথ্যচিত্রে এই প্রতিরোধের গাথাতে কী করে নাইন্থ সিম্ফনির সুর মিশে আছে, সে কথাই আমরা দেখতে-শুনতে পাই। জার্মানিতে দেওয়াল ভেঙে যাওয়ার পর সেখানেই বার্লিনের এক কনসার্ট হলে নাইন্থ সিম্ফনির পারফরমেন্স করেন বিখ্যাত আমেরিকান কন্ডাক্টর লেওনার্ড বার্নস্টেইন—সারা বিশ্ব থেকে মিউজিশিয়ানরা অংশগ্রহণ করেছিলেন সেখানে। এতদিন যেমন দেওয়ালের কাছে গেলেই ছিল গুলি খাওয়ার ভয়, দেশবাসী কী পরবে, কী খাবে, কার সাথে কথা বলবে, সবেতেই ছিল শাসকের রক্তচক্ষু। তার থেকে মুক্তি পাওয়ার আনন্দেই, বার্নস্টেইন ‘ওড টু জয়’-এর শেষ শব্দটি বদলে দেন ‘ফ্রিডম’-এ। বিঠোফেনের সুর যেন মূহুর্তে প্রায় দেড় শতাব্দী পর তাঁরই নিজের দেশ জার্মানির স্বাধীনতার সমার্থক হয়ে যায়।

চিনের তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের কাহিনীও প্রায় রূপকথার মতো। সেই ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক—ফেং কংদে। ফেং বলছিলেন, কমিউনিস্ট চায়নাতে যখন ইউরোপের সবকিছুকেই বুর্জোয়া বলে বাতিল করে দেওয়া হত—তখন আমরা সারাক্ষণ হাঁসফাঁস করতাম, এই বুঝি কারও হাতের কোনো বই, কারও কাছে থাকা কোনো মিউজিকের রেকর্ড বাজেয়াপ্ত করে তাকে দেশদ্রোহী ঠাউরে ফেলা হবে। তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের সেই জমায়েতের সময় আমরা প্রথম নির্ভীক ভাবে স্কোয়ারের নানা প্রান্তে লাউডস্পিকার লাগিয়ে দিই—সর্বপ্রথম স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে বিঠোফেনের নাইন্থ সিম্ফনি চালিয়ে দেওয়া হয়। যা এতদিন ছিল নিষিদ্ধ। লক্ষ লক্ষ ছাত্র মিছিল করছেন, মাটি কামড়ে পড়ে লড়াই করছেন, তাঁদের মাথার উপর শয়ে শয়ে লাউডস্পিকারে বাজছে ওড টু জয়ের সেই অলৌকিক মূর্চ্ছনা। সে সুর হয়ে উঠছে তাঁদের লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ফেং বলেন, মাঝে মাঝে দেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা বাজানোর চেষ্টা করত মিলিটারি বাহিনী—আর আমরা আরও জোরে নাইন্থ সিম্ফনি চালিয়ে দিতাম। বিঠোফেনের সুরে ঢাকা পড়ে যেত স্বৈরাচারী শাসকের কন্ঠ!

চিলিতে মিলিটারি ডিক্টেটরশিপে টর্চার চেম্বারের চোরা কুঠুরিতে আবদ্ধ থাকা এক যুবক আমাদের যেন আরেক রূপকথার কাহিনী উপহার দেন। রেনাতো আলভার্দো নামের সেই যুবক বলেন, লড়াইয়ের একদম শেষের দিকে—তিনি যখন গারদে বসে বদ্ধতার দিন গুনছেন—হঠাৎ মাথার উপর এক চিলতে জানলা দিয়ে তাঁর কাছে ভেসে আসে এক সুর। তিনি অবাক হয়ে আবিষ্কার করেন, পিনোশের পতন হয়েছে, চিলির রাজপথে মানুষ মিছিল করছের মুক্তির আনন্দে—স্প্যানিশ অনুবাদে তাঁরা গাইছেন ওড টু জয়ের সেই সুর। আক্ষরিক অর্থেই আলভার্দোর কাছে সেই সুর এসেছিল দীর্ঘ অত্যাচার, কারাবাস আর বন্দীত্ব সহ্য করার পর মুক্তির বার্তার মতো!

শুনুন…

লেখা: সায়ন্তন দত্ত
পাঠ: সুশোভন প্রামাণিক
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল