বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ থেকে, পতঙ্গ

Published by: Sankha Biswas |    Posted: January 17, 2021 8:01 pm|    Updated: January 28, 2021 9:41 pm

Published by: Sankha Biswas Posted: January 17, 2021 8:01 pm Updated: January 28, 2021 9:41 pm

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমের ভগিনীপতি কৃষ্ণধন মুখোপাধ্যায় একদা বঙ্কিমচন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, তিনি তাঁর রচনার মধ্যে কোনটিকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন? উত্তরে বঙ্কিমচন্দ্র কিছুমাত্র চিন্তা না-করে হাসতে হাসতে জবাব দিয়েছিলেন, ‘কমলাকান্তের দপ্তর‘। প্রকৃত অর্থেই, এ গ্রন্থকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে মেনে নিতে কোনো দ্বিধা-কুন্ঠা জাগে না। কেননা, ‘হাসির সঙ্গে কারুণ্যের, অদ্ভুতের সঙ্গে সত্যের, তরলতার সহিত মর্মদায়িনী জ্বালার, নেশার সঙ্গে তত্ত্ববোধের,… এমন মনোমোহন সমন্বয় কে কবে দেখিয়াছে’? ১৮৭৫ খ্রীস্টাব্দে রচিত এই রচনাগুলি, তৎকালীন ‘বাবু সংস্কৃতি’-কে বিদ্রুপ করে লেখা। যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

পাঠ হওয়া কাহিনিটির নির্বাচিত অংশ রইল নিচে।

ঝিমাইতে ঝিমাইতে দেখিলাম যে, একটা পতঙ্গ আসিয়া, ফানুষের চারি পাশে শব্দ করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। “চোঁ-ও-ও-ও” “বোঁ-ও-ও” করিয়া শব্দ করিতেছে। আফিমের ঝোঁকে মনে করিলাম, পতঙ্গের ভাষা কি বুঝিতে পারি না? কিছুক্ষণ কান পাতিয়া শুনিলাম—কিছু বুঝিতে পারিলাম না। মনে মনে পতঙ্গকে বলিলাম, “তুমি কি ও চোঁ বোঁ করিয়া বলিতেছ, আমি কিছু বুঝিতে পারিতেছি না।” তখন হঠাৎ আফিম প্রসাদাৎ দিব্য কর্ণ প্রাপ্ত হইলাম—শুনিলাম, পতঙ্গ বলিল, “আমি আলোর সঙ্গে কথা কহিতেছি—তুমি চুপ কর।” আমি তখন চুপ করিয়া পতঙ্গের কথা শুনিতে লাগিলাম। পতঙ্গ বলিতেছে—

দেখ, আলো মহাশয়, তুমি সে কালে ভাল ছিলে—পিতলের পিলসুজের উপর মেটে প্রদীপে শোভা পাইতে—আমরা স্বচ্ছন্দে পুড়িয়া মরিতাম। এখন আবার সেজের ভিতর ঢুকিয়াছ—আমরা চারি দিকে ঘুরে বেড়াই—প্রবেশ করিবার পথ পাই না, পুড়িয়া মরিতে পাই না।

দেখ, পুড়িয়া মরিতে আমাদের রাইট আছে—আমাদের চিরকালের হক্‌। আমরা পতঙ্গজাতি, পূর্ব্বাপর আলোতে পুড়িয়া মরিয়া আসিতেছি—কখন কোন আলো আমাদের বারণ করে নাই। তেলের আলো, বাতির আলো, কাঠের আলো, কোন আলো কখন বারণ করে নাই। তুমি কাচ মুড়ি দিয়া আছ কেন, প্রভু? আমরা গরিব পতঙ্গ—আমাদের উপর সহমরণ নিষেধের আইন জারি কেন? আমরা কি হিন্দুর মেয়ে যে, পুড়িয়া মরিতে পাব না?

দেখ, হিঁদুর মেয়ের সঙ্গে আমাদের অনেক প্রভেদ। হিঁদুর মেয়েরা আশা ভরসা থাকিতে কখন পুড়িয়া মরিতে চাহে না—আগে বিধবা হয়, তবে পুড়িয়া মরিতে বসে। আমরাই কেবল সকল সময়ে আত্মবিসর্জ্জনে ইচ্ছুক। আমাদের সঙ্গে স্ত্রীজাতির তুলনা?

 

শুনুন… তারপর কি হইল…

লেখা: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
পাঠ: কোরক সামন্ত
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল