অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদ্মদাসী

Published by: Sankha Biswas |    Posted: January 3, 2021 7:26 pm|    Updated: January 3, 2021 7:26 pm

Published by: Sankha Biswas Posted: January 3, 2021 7:26 pm Updated: January 3, 2021 7:26 pm

একেবারে রাতের অন্ধকারের মতো কালো ছিল আমার দাসী—সে কাছে বসেই ঘুম পাড়াত কিন্তু অন্ধকারে মিলিয়ে থাকত সে, দেখতে পেতেম না তাকে, শুধু ছোঁয়া পেতেম থেকে থেকে। কোনো-কোনো দিন অনেক রাতে সে জেগে বসে নাড়ু-চালভাজা কটকট চিবোত আর তালপাতার পাখা নিয়ে মশা তাড়াত। শুধু শব্দে জানতাম এটা। আমি জেগে আছি জানলে দাসী চুপিচুপি একখানি নারকেল-নাড়ু অন্ধকারেই অমার মুখে গুজে দিত-নিত্য খোরাকের উপরি-পাওনা ছিল এই নাড়ু।

খাটে উঠব কেমন করে এই ভয় হয়েছিল কাজেই বোধ হয় উঁচু পালঙ্কে শোয়া সেই আমার প্রথম। জানি নে তার আগে কোথায় কোন্ ঘরে আমাকে নিয়ে শুইয়ে দিত কোন্ বিছানায় সে। চারদিকে সবুজ মশারির আবছায়া-ঘেরা মস্ত বিছানাটা ভারি নতূন ঠেকছিল সেদিন —একটা যেন কোন দেশে এসেছি-সেখানে বালিশগুলোকে দেখাচ্ছে যেন পাহাড়-পর্বত, মশারিটা যেন সবুজ কুয়াশা  ঢাকা আকাশ যার ওপারে—এখানে আর মনে করতে হত না, দেখতে পেতেম চিৎপুর রাস্তা খেকে সরু গলিটা! আমাদের ফটকে এসে ধুকছে সেটা একেবারে জনশুন্য।

দু নম্বর বাড়ির গায়ে তখনকার মিউনিসিপালিটির দেওয়া একঢা মিটামিটে তেলের বাতি জ্বলছে আর সেই আলো-আধারে পুরোনো শিবমান্দিরটার দরজার সামনে দিয়ে একটা কন্ধ-কাটা দুই হাত মেলে শিকার খুজে চলেছে!

কন্ধ-কাটা বাসাটাও সেইসঙ্গে দেখা দিত। মটির নল বেয়ে দু নম্বর  বাড়ির ময়লা জল পড়ে পড়ে খানিকটা দেওয়াল সোঁতা আর কালো, ঠিক তারই কাছে আধখানা ভাঙা কপাট চাপানো আড়ই হাত একটা ফোঁকরে তার বাস—দিনেও তার মধ্যে অন্ধকার জমা হয়ে থাকে।

সব ভূতের মধ্যে ভীষণ ছিল এই কন্ধ-কাটা, যার পেটটা থেকে থেকে অন্ধকারে হাঁ করে আর ঢোক গেলে; যার চোখ নেই অথচ মস্ত কাঁকড়ার দাড়ার মতো হাত দুটো যার পরিষ্কার দেখতে পায় শিকার! আর-একটা ভয় আসত সময়ে সময়ে! কিন্তু আসত সে অকাতর ঘুমের মধ্যে সে নামত বিরাট একটা আগুনের ভাঁটার মতো বাড়ির ছাদ ফুঁড়ে আস্তে আস্তে আমার খাটের উপর। যেন আমাকে চেপে মারবে এই ভাব—নামছে তো নামছেই গলাটা, আমার দিকে এগিয়ে আসার তার বিরাম নেই।

লেখা: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাঠ: সুশোভন প্রামাণিক
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল