দেবী চৌধুরাণী, এ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া, বঙ্কুবাবুর বন্ধু, ময়মনসিংহ গীতিকা, সত্যজিৎ রায়ের ভাবনা ও খসড়া থেকে না করতে পারা ছবির তালিকা ছিল আরও দীর্ঘ

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 8, 2021 9:29 pm|    Updated: April 8, 2021 9:49 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 8, 2021 9:29 pm Updated: April 8, 2021 9:49 pm

বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা সত্যজিৎ খুবই পছন্দ করতেন। ১৯৬০ সাল নাগাদ সত্যজিৎ সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় জনরব ওঠে—‘সম্প্রতি আমরা শুনলাম, বঙ্কিমচন্দ্রের দেবী চৌধুরাণী উপন্যাসটির চিত্ররূপায়নের দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেছেন।’ সেই সঙ্গে আরও ছাপা হয়, “বঙ্কিমচন্দ্রের দেবী চৌধুরাণীকে নতুন করে ছবির পর্দায় রূপায়িত করবার সঙ্কল্প গ্রহণ করেছেন এনসিএ প্রোডাকসন্স। সত্যজিৎ রায়ের ওপর পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে।” ১৯৬০-এর শেষ দিকে এই ‘জনরব’ আরও বিশদ হয়েছিল বলে পার্থ বসু জানাচ্ছেন। একটি প্রথম সারির সংবাদপত্রে ১৩৬৭’তে ছাপা হয়, প্রফুল্লর ভূমিকায় নির্বাচিত হয়েছেন সুচিত্রা সেন এবং ব্রজেশ্বরের ভূমিকায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। বাংলা এবং হিন্দি এই দ্বিভাষিক ছবির ‘এমনকি ইংরাজিতে এর তৃতীয় রূপ বিদেশের জন্য তৈরি হবে বলেও অনুমান করা হচ্ছে।’

এক বছর এইভাবেই জনশ্রুতিতে কাটে অমিয় সান্যাল একটি লেখায় জানাচ্ছেন—“বিশেষ করে বঙ্কিম বর্ণিত ‘দেবী চৌধুরানী’র সেই বিখ্যাত বজরাটি তৈরি করার জন্য বংশী চন্দ্রগুপ্ত তাঁর সমস্ত প্রাথমিক কাজগুলিও সম্পূর্ণ করেছিলেন।” সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ‘এক্সক্লুসিভ ডেট’-এর সমস্যার কারণে এই পরিকল্পনাটি বাতিল হয়। কিন্তু সত্যজিতের স্মৃতিতে থেকে গিয়েছিল ‘দেবী চৌধুরাণী’-র আখ্যান। নিশ্চয় এই কথার স্বপক্ষে আপনারা প্রমাণ চাইবেন? ’৬৪-৬৫ সাল নাগাদ সত্যজিৎ তাঁর ‘নায়ক’ ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন। ‘নায়ক’ ছবির একটি বিশেষ দৃশ্য স্মরণ করুন। থিয়েটারের সেই দৃশ্যে অরিন্দম যে ভূমিকায় অভিনয় করে, তা ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসের ব্রজেশ্বরের চরিত্র।

শুধু ‘দেবী চৌধুরাণী’ই নয়, সত্যজিতের না-বানাতে-পারা ফিল্মের সংখ্যা আরও বেশ কয়েকটি। কয়েকটির ক্ষেত্রে চিত্রনাট্য লেখা অবধি হয়ে গিয়েছিল!

সত্যজিতের না-হওয়া চলচ্চিত্রের মধ্যে, নিঃসন্দেহে সবচেয়ে চর্চিত ‘দ্য এলিয়েন’। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি সংখ্যা ‘সন্দেশ’-এ প্রকাশিত হয়েছিল, তাঁর লেখা গল্প ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’। এই কাহিনি-সূত্রটিকেই তিনি ‘৬৪ সাল নাগাদ বৃহত্তর আকারে ‘দ্য এলিয়েন’ নামক একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রূপে কল্পনা করেন। বহির্জাগতিক এক প্রাণী, কীভাবে পৃথিবীতে এসে, ‘মঙ্গলপুর’ গ্রামের ছোট্ট বালক হাবার সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলল, সেই নিয়েই এক কাহিনি। এই বছরই কল্পবিজ্ঞান লেখক আর্থার সি ক্লার্কের সঙ্গে সত্যজিতের পরিচয় হয়েছিল। প্রথমে চিঠিতে আলাপ, তারপরে লন্ডনে তাদের সাক্ষাত। ক্লার্কের মারফত সত্যজিতের সঙ্গে আলাপ হয় মাইক উইলসনের।  মাইক উইলসন মারফৎ কলাম্বিয়া পিকচার্স সত্যজিতের এই ছবিটি প্রযোজনা করবেন এমনই ঠিক হয়। ছবিতে মোহন আর তার স্ত্রীর ভূমিকায় তিনি ভেবেছিলেন শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় আর অপর্ণা সেনের কথা। মাড়োয়ারি চরিত্র শ্যামলাল বাজোরিয়ার ভূমিকায় ভেবেছিলেন পিটার সেলার্সের কথা। ‘৬৭ সালে পিটার সেলার্সের সঙ্গে এ-বিষয়ে সত্যজিতের প্রাথমিক কথাবার্তা হয়। এই বছরই জুনে সত্যজিৎ এই ছবির ব্যাপারে কথা বলতে পৌঁছান হলিউড।

কলাম্বিয়ার সঙ্গে সত্যজিতের পাকা কথাই প্রায় হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই পাকা ঘুঁটিও কেঁচিয়ে গেল! সত্যজিৎ কলাম্বিয়ার সঙ্গে সরাসরি কথা বলে জানতে পারলেন, যে চিত্রনাট্যকার হিসেবে সত্যজিতের সঙ্গে মাইকেরও নাম জুড়ে গিয়েছে এবং কলম্বিয়ার থেকে চিত্রনাট্য বাবদ মাইক দশ হাজার ডলার অগ্রিম নিয়ে নিয়েছেন, সত্যজিতের তরফ থেকে! তিনি তো এসবের কিছুই জানেন না।

তারপর? শুনুন…

লেখা: নির্মাল্য কুমার ঘোষ
পাঠ: জয়ন্ত মিত্র
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল