তিনিই ভারতের প্রথম আলোকচিত্রশিল্পী যিনি ‘টেকনিকালার’ পদ্ধতিতে ছবি তুলেছিলেন, ‘রিভার’ ফিল্মে কাজের সূত্রে কিংবদন্তি পরিচালক জঁ রেনোয়া’র সঙ্গে হয়েছিল অপার-আমৃত্যু বন্ধুত্ব

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 27, 2021 11:05 pm|    Updated: April 28, 2021 3:11 am

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 27, 2021 11:05 pm Updated: April 28, 2021 3:11 am

সিনেমার জগতে আসার নেপথ্যে ছিল, পরিচালক বিমল রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ। বিমল রায়ের দাদা ছিলেন আবার তাঁর দাদার বন্ধু। ইন্দ্রলোক স্টুডিওতে দিনের পর দিন স্রেফ বসে থেকেছেন, ভেতরে ঢুকতেই পারেননি। ক্যামেরার কাজ করতে এসে প্রথম আলাপ ইংল্যান্ডের ক্যামেরাম্যান পিটার ডি ব্র্যা়ডলির সঙ্গে। প্রথম এক বছর ক্যামেরা ছুঁতেই দেননি। শুধু কীভাবে ক্যামেরা খোলা হচ্ছে, লাগানো হচ্ছে, আর কীভাবে ট্রলি হচ্ছে এই দেখে দেখেই কেটে গেল। তাঁরও মনটা বিষণ্ণ হয়ে থাকত। প্রথম দুটো বছর কেটেছ একেবারে পারিশ্রমিক-হীন ভাবে।

‘দিল হি তো হ্যায়’ ছবিটিতে তাঁর কাজ শুরু ‘সেকেন্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যামেরাম্যান’ হিসেবে। এর পরেও বেশ কয়েকটি ছবিতে কাজ করেছিলেন ‘ফিল্ম কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া’র জন্য। কিন্তু ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংকটে কাঁচা ফিল্মের সংকটে অনেক স্টুডিও বন্ধ হয়ে যায়, ফিল্মের কাজ ছেড়ে একটি কারখানায় কাজ গ্রহণ করেন।

আবার এই কাজে ফেরেন, ১৯৪৫ সালে। অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘পূর্বরাগ’ তাঁর প্রথম বাংলা ছবি। এই ছবিতে তাঁর সহকারি ছিলেন পরর্বতী কালের বিখ্যাত পরিচালক অসিত সেন। রামানন্দ সেনগুপ্তের সাথে এই ছবিতে আরও কয়েকজন বিখ্যাত ব্যাক্তিত্বের চলচ্চিত্র জগতে আত্মপ্রকাশ হয়। এঁদের মধ্যে ছিলেন সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, গীতিকার হিসেবে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার এবং অভিনেতা হিসেবে জহর রায়।

১৯৪৯-৫০ সালে রুমার গর্ডন-এর লেখা ‘রিভার’ উপন্যাসটিকে চলমান চিত্রমালা’য় ধরতে, ভারতে এলেন কিংবদন্তি পরিচালক জঁ রেনোয়া। গেভা টেকনিকালার নামে রঙিন প্রযুক্তিতে কাজের অভিজ্ঞতা সে সময় কারুরই বিশেষ ছিল না। রেনোয়া নিজের ভ্রাতুষ্পুত্র ক্লড রেনোয়ার সঙ্গে রামানন্দকে তিন মাসের জন্য ইংল্যান্ডে প্রশিক্ষণ নিতে পাঠান। ওই ছবিতে ‘অপারেটিভ ক্যামেরাম্যান’ হিসেবে রামানন্দ কাজ করেন। এদেশে তিনিই প্রথম আলোকচিত্রশিল্পী যিনি ‘টেকনিকালার’ এ ছবি তুলেছিলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে-এও ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

কলকাতায় রেনোয়াকে পেয়ে প্রভূত উপকার হয়েছিল নবীন চলচ্চিত্রবিদদের। চিদানন্দ দাশগুপ্ত, সত্যজিৎ রায় প্রায়ই সন্ধেতে রেনোয়ার কাছে যেতেন। সত্যজিৎ তখন বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি.জে.কিমার-এ চাকরি করেন। কমলকুমার মজুমদার প্রায়ই আসতেন, দুরন্ত ফরাসি জানার দরুন।

সেই কাজ থেকেই রেনোয়ার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব। সেনগুপ্ত পরিবারের আত্মীয়বর্গে ঢুকে পড়ে রেনোয়া পরিবার। রামানন্দর বাড়িতেও গিয়েছিলেন রেনোয়া। চালের গুঁড়োর আলপনা দেখে আর বেলের শরবত খেয়ে তিনি মুগ্ধ! এমনকী ব্যারাকপুরে শ্যুটিং চলার সময় রোজ সকালে রেনোয়া রামানন্দ-পত্নী মিনুর সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করে তবেই শ্যুটিং-এ যেতেন। টুকরো-টুকরো স্মৃতি রোমন্থন করে রামানন্দ জঁ রেনোয়ার মতো বিরাট ব্যক্তিত্বের পুনর্নির্মাণ করেছেন। তার মধ্যে কয়েকটি স্মৃতি মানুষ রেনোয়াকে চিনিয়ে দেয়। বড় মানুষেরা কত সহজ এবং আড়ম্বরহীন হন।

রেনোয়া নিজে রাজনীতির জুয়া এবং যুদ্ধ দুই-ই প্রবল ঘেন্না করতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যেতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। পায়ে লেগেছিল একটি গুলি। সেই গুলির ক্ষতর কারণে সারা জীবন তিনি খুঁড়িয়ে হাঁটতেন। দেশভাগের ক্ষত ও ক্ষতি কীভাবে রেনোয়ার মনকেও বিপর্যস্ত করেছিল, তার চূড়ান্ত নমুনা পাই একটি ঘটনার উল্লেখে।

কী সেই ঘটনা! শুনুন…

লেখা: সুশোভন প্রামাণিক
পাঠ: অনুরণ সেনগুপ্ত
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল