মরণের পরপারে যে অন্ধকার; গুরু দত্তের কাগজ কে ফুল ফিল্মের একটি গান, শিল্পের অবিনশ্বরতার এক দলিল

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 17, 2021 11:07 pm|    Updated: May 8, 2021 11:10 am

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 17, 2021 11:07 pm Updated: May 8, 2021 11:10 am

‘কাগজ কে ফুল’ ছবির গল্প অনেকেই জানেন।

সুরেশ দাপুটে ফিল্ম-ডিরেক্টর, খ্যাতির মধ্যগগনে। ‘দেবদাস’ ছবি করতে গিয়ে হুট করে পারোর চরিত্রে পছন্দ হয়ে যায় অনামী, অনাথ এক মেয়েকে। শান্তি। এদিকে সুরেশের জীবন ছারখার দাম্পত্য সমস্যায়। সুরেশ আর শান্তির অমন এক অলৌকিক মুহূর্তে অনুভব হয়— তাদের মধ্যে কী যেন এক হয়ে গেছে। অথচ তারা দুজনেই জানে, এই ‘কী যেন এক’ হওয়ার আগে থেকেই অভিশপ্ত—সুরেশ বিবাহিত, তার ছোট্ট মেয়ে প্রাণপণে চেষ্টা করছে বাবা-মা’কে মিলিয়ে দিতে। ওদিকে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সবাই ছোঁকছোঁক করছে সামান্য যে কোনও স্ক্যান্ডালের খবরের জন্য, ট্যাবলয়েডের পাতা তাহলে ভরিয়ে তোলা যাবে। অথচ, সেই ‘কী যেন এক’—যার নাম নেই, নির্দিষ্ট অর্থ নেই, যা শব্দের এই নশ্বরতার ওপারে—তা জন্ম থেকেই অভিশপ্ত—তারা জানে তাদের এই ‘কী যেন এক’ ত্যাগ করতে হবে। হবেই।

এই অবিনশ্বর মুহূর্তেই—‘কাগজ কে ফুল’ ছবির এই দৃশ্য। সুরেশ সবার আগে স্টুডিওতে এসে বসে থাকে, ইমেজ নির্মাণের জন্য তার একাকীত্বের প্রয়োজন হয়। সেদিন সেই একাকীত্বের মুহূর্তে সুরেশ দেখে, স্টুডিওটে শান্তিও বসে আছে। একা। সামান্য দু’কথার পরেই দু’জনেই তারা বোঝে, কী হয়ে গেছে এবং কী হতে চলেছে। অতএব এ মুহূর্ত, শব্দের অতীত, কথার অতীত, নশ্বর সব তুচ্ছতার অতীত। এমন সময়েই তো সুরের প্রয়োজন, কবিতা ও সংগীতের প্রয়োজন।

অতএব শুধু সুরেশ-শান্তি’কে দিয়ে আর হবে না, প্রয়োজন কাইফি আজমি’র, যিনি এই তুচ্ছ ‘কথা’কে কথাহীনতায় নিয়ে যাবেন। প্রয়োজন শচীন দেব বর্মণের, যিনি মহাসমুদ্রের ঢেউ-এর মত অর্কেস্ট্রা আছড়ে ফেলবেন, প্রয়োজন গীতা দত্তের, যিনি এতে কণ্ঠ দেবেন। ভি কে মূর্তি—এমন গা ছমছমে আলো, এমন অন্ধকার, এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন আলো, এমন অলৌকিক নির্মাণ করবেন। আর, অবশ্যই ওয়াহিদা রহমান আর গুরু দত্ত’রও। যে দু’জন মুখের প্রতিটি পেশী দিয়ে, প্রতিটি শিরায় মৃতদের পেরিয়ে এসে অমন প্যারফর্মেন্স নজির রাখবেন, অমন ভাবে চেয়ে থাকবেন। আর গুরু দত্ত নিজেও, পরিচালনা করবেন।

প্রখ্যাত সিনে আলোচক এবং পরিচালক অরুণ খোপকর এই মুহূর্ত প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, এই ‘কী যেন এক’ মুহূর্তগুলো বাইরে থেকে দেখতে আর পাঁচটা মুহূর্তের মতোই লাগে, তবে শিল্প একে নশ্বরতার ওপারে নিয়ে যাবে কী করে? দু’জন মানুষের মধ্যে, বাকি সবার অজান্তেই যে এক যৌথ পৃথিবী তৈরি হচ্ছে, তাকে সিনেমার ভাষায় রূপ দেবে কী করে? ক্যামেরা তো শুধু বাইরের ছবিই দেখতে পারে, সাউন্ড রেকর্ডার তো শুধু যে ‘শব্দ’ পৃথিবীতে মূর্ত, তাকেই শুনতে পায়, পারে। তবে কী করে ধরা যাবে আত্মার ছবি ও স্পন্দন? কী করে শোনা যাবে এমন কোনও শব্দ, যা উচ্চারিতই হয়নি?

শুনুন…

লেখা: সায়ন্তন দত্ত
পাঠ: শঙ্খ বিশ্বাস
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল