‘এই আমি আর সেই আমি নই’ সত্যজিৎ রায়ের নায়ক; ছায়ার জগতে বিচরণ করা এক নায়কের জীবনের নানা চোরাবালির সন্ধান

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: May 18, 2021 10:53 pm|    Updated: May 18, 2021 10:57 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: May 18, 2021 10:53 pm Updated: May 18, 2021 10:57 pm

গাড়ি কাছাকাছি যেতেই বন্ধ কাঁচ ভেদ করে আওয়াজ আসে, অরিন্দম শুনতে পায়, ‘কমরেড অরিন্দম মুখার্জী জিন্দাবাদ! অরিন্দম সন্ত্রস্ত হয়—সে বুঝতেই পারে না বীরেশ আসলে কী চায়! সানগ্লাস পরা কালো চোখে সে বীরেশের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করে—’তোর মতলবটা কী!’ বীরেশ গাড়ির দরজা খুলতে গেলে অরিন্দম হাত চেপে দরজা আটকে রাখে। বীরেশ বলে, “কিছুই না, তুই নীচে নেমে দুটো কথা বলবি, ওরা একটু মনে জোর পাবে। চব্বিশ দিন হল স্ট্রাইক চলছে, আমি তোর কথা ওদেরকে বলেছি, ওরা তোকে এক্সপেক্ট করছে”। কালো চশমার আড়ালে অরিন্দমের সারা মুখে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম – সে কিছুতেই গাড়ী থেকে নামতে রাজী নয়। সে বলে, “আমাদের লাইনের ব্যাপার তুই জানিস না, এসব ব্যাপারে আমাদের জড়ানো চলে না!”। বীরেশ ততক্ষণে বুঝে গেছে, পাঁচ বছর আগে তার সঙ্গে কার্ল মার্কস আওড়ানো সেই বন্ধু আর এই বন্ধু নেই। বীরেশ তাও শেষ চেষ্টা করে, “তোর এদের ব্যাপারে কোনো ফিলিংস নেই?” অরিন্দম সেই মোক্ষম উত্তরটি দেয়, “এই আমি আর সেই আমি নই! ফিলিংস এর কথা এখানে উঠছেই না, তুই টাকা লাগলে বল, যা চাইবি তাই দেব। কিন্তু রাজনীতিতে আমাদের এভাবে জড়ানো চলে না! বাজার থাকবে না”।

১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া সত্যজিৎ রায় নির্দেশিত এবং উত্তমকুমার-শর্মিলা ঠাকুর অভিনীত ‘নায়ক’ ছবির এই অংশটি নানা কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সত্যজিতের নিজের জীবনে তো বটেই—একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, বীরেশ নামক এই বামপন্থী রাজনৈতিক নেতার মাধ্যমে, কোনো রাজনীতিকের এরকম সক্রিয় উপস্থিতি সত্যজিতের ছবিতে এর আগে এত স্পষ্ট ভাবে আসেনি। গোটা নায়ক ছবিটিই, বস্তুত গ্ল্যামার জগতের এক তারকা, চূড়ান্ত বিখ্যাত এবং ছায়ার জগতে বিচরণ করা এক নায়কের জীবনের নানা চোরাবালির সন্ধান। খ্যাতি এবং অর্থনৈতিক সাফল্যের দিকে তরতর করে উঠে যাওয়া অরিন্দম মুখার্জীর চরিত্রটি অনেকটাই উত্তমকুমারের জীবনের কিয়দংশের উপর আধারিত—এবং খানিক ভাবলে এই আন্দাজও করতে পারি—সত্যজিৎ রায়ের নিজেরও অন্তর্জীবনের নানান জটিলতা পরোক্ষভাবে এই ছবিতে স্থান পেয়েছে। কারণ গ্ল্যামার জগতের বাসিন্দা তো উত্তমকুমার একা নন—সত্যজিৎও আন্তর্জাতিক দুনিয়ার আর্ট-হাউস সিনেমায় অন্যতম গ্ল্যামারাস নাম। সে জগৎ হয়ত পপুলার ছবি বানিয়ে মানুষের মনোরঞ্জন করতে শুধু ব্যস্ত থাকে না – কিন্তু সে জগতেরও কায়দা কানুন আছে, সে জগতেও নানা জটিলতার মাধ্যমে শিল্প কেনাবেচা’ই হয়। অরিন্দম এক জায়গায় বলে, ‘ফিল্ম তো, আফটার অল একটা ব্যবসাও’। এ সংলাপ শুধুমাত্র ‘পপুলার কমার্শিয়াল ফিল্ম’ সম্পর্কে ভাবলে ভুল হবে – সত্যজিৎ রায় যে গোত্রের ছবি তৈরি করতেন, তাও অন্যরকম একটা ‘ব্যবসা’র বাইরে ছিল না। ব্যবসা এবং সে সংক্রান্ত নানা জটিল প্রশ্ন ‘নায়ক’ ছবির অত্যন্ত জরুরি একটা জায়গা।

গোটা ছবি জুড়ে বারবার যে জায়গাটিকে আন্ডারলাইন করা হয় – অরিন্দম মুখার্জীর বাজার হারানোর ভয়, খ্যাতির দুনিয়া থেকে হঠাৎ করে পড়ে যাওয়ার ভয়। আবার অন্যদিকে আরেকটি ভয় – শর্মিলা অভিনীত চরিত্র অদিতি যে প্রশ্ন অরিন্দমকে করে – “এই যে এত বেশী করে পাওয়া, এর মধ্যে কোনো ফাঁক নেই? কোনো রিগ্রেটস নেই আপনার?” অরিন্দম সেই বাজার হারানোর ভয়, এই প্রশ্নকে এড়িয়ে যেতে চায়, কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারে, এতদিন চেপে থাকা তার জীবনের নানা জটিল, না মেলা হিসেবের আখ্যান যেন এই মেয়েটির প্রশ্নের সামনে ঠেলে বেরিয়ে আসছে। সে ঘুমিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখে, টাকার চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে। শঙ্করদা, অরিন্দমের এককালের থিয়েটার শিক্ষক, যিনি কোনওমতেই অরিন্দমকে ফিল্মে নামতে দিতে রাজী ছিলেন না, তাঁর অকালে মৃত্যুর দিনই অরিন্দম শ্মশানে বসে ফিল্মে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—সেই শঙ্করদাকে অরিন্দম স্বপ্নে দেখে, তাকে তলিয়ে যেতে দেখেও তিনি হাত বাড়িয়ে সাহায্য করছেন না। অরিন্দম এই সব হিসেব না মেলা গল্প অদিতিকে বলতে শুরু করে—তেমনই একটি গল্প বীরেশের—

শুনুন…

লেখা: সায়ন্তন দত্ত
পাঠ: সুশোভন প্রামাণিক
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল