সব শিল্পীর জীবনীই ধ্বংস করে দেওয়া উচিত, মনে করতেন কিংবদন্তি অরসন ওয়েলস

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: May 6, 2021 9:14 pm|    Updated: May 7, 2021 6:29 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: May 6, 2021 9:14 pm Updated: May 7, 2021 6:29 pm

১৯৩১ সাল। কিশোর অরসনের বয়স তখন মাত্র পনেরো। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার জন্য স্কলারশিপ অর্জন করলেন। মা-বাবার মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে তার অনেকদিন আগেই। মা মারা গেছেন ওয়েলসের বয়স তখন মাত্র আট।  অরসন থাকতেন বাবার সঙ্গে। তিনিও মারা যান ১৯৩০-এর ডিসেম্বরে। অভিভাবকহীন অরসন অতি কম বয়সেই কার্যত নিজের জীবন বিষয়ে স্বাধীন হয়ে, সিদ্ধান্ত নেন। আর পড়াশোনা নয়, এবার তিনি জীবনে অন্য কিছু করবেন। বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। কিছুদিন শিকাগোর ‘আর্ট ইনস্টিটিউট’-এ পড়াশোনা করলেন। কিন্তু মন বিশেষ বসল না। উত্তারাধিকার সূত্রে পাওয়া টাকাকড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ইউরোপের উদ্দেশ্যে, থিয়েটার করবেন এই স্পৃহায়।

১৯৩১-এর ডিসেম্বরে লন্ডনে প্রথম থিয়েটারের অভিনেতা হিসেবে তাঁর শিল্পী জীবনের শুরুয়াৎ। ওই পনেরো বছর বয়সেই—যে অভিনয় আজীবন তাঁর সঙ্গী হয়ে থাকবে। শুরুতেই যদিও তিনি প্রত্যাশিত সাফল্য পাননি। খানিক ইউরোপ বাসের পর আবার ফিরে আসেন আমেরিকায়।

১৯৩৪ সাল—চাকরি শুরু করলেন, রেডিওতে। এমনিতেই ছিলেন সুকন্ঠের অধিকারী। নিজেই জানিয়েছিলেন, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তাঁর এক ছবিতে তাঁকে ভয়েস-ওভার দিতে বলেছিলেন। রেডিওতে কাজ করতে গিয়ে জীবনের প্রথম সাড়া জাগানো কাজ করেন অরসন।

****

১৯৪১ সালে ‘সিটিজেন কেন’ মুক্তি পাওয়ার পরেই চলচ্চিত্র মহলে হইচই পড়ে যায়। কলকাতায় বসে সত্যজিৎ রায়ও এই ছবি দেখে তাঁর প্রবন্ধ, ‘চলচ্চিত্রের ভাষা: একাল ও সেকাল’, তাঁর মুগ্ধতার কথা লেখেন, “দর্শকদের চোখ, কান ও মন এই তিনটে সম্পর্কে একটা সজাগ সাবধানতা অবলম্বন করে হলিউডের ছবি তৈরী হয়ে আসছিল। ওয়েলস অম্লানবদনে তিনটিকেই একসঙ্গে আঘাত করলেন”।

অবশ্য এ আঘাতের ফল ভালো হয়নি। সাড়া জাগানো এ ছবির পরেই হলিউডের কর্তাব্যক্তিরা নড়েচড়ে বসেন—এত সম্ভাবনাময় এক শিল্পীকে সিনেমার সবচেয়ে বড় ইন্ডাস্ট্রি আর রেহাই দেয়নি। ‘সিটিজেন কেন’ ছবি অবধি যদি ওয়েলসের কেরিয়ারগ্রাফ ছিল শুধুই উর্দ্ধমুখী—এরপর ভীষণ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে তাঁকে ছবি বানাতে হয়েছে। এর পরের ছবিই, ‘দ্য ম্যাগনিফিসিয়েন্ট অ্যাম্বারসনস’–সে ছবির ফাইনাল কাট আর ওয়েলসের হাতে ছাড়া হয়নি। এরপর প্রায় সব ছবিতেই—’দ্য স্ট্রেঞ্জার’, ‘দ্য লেডি ফ্রম সাংহাই’তিনি শেষ করার পর প্রযোজকরা নিজেদের ইচ্ছেমতো এডিট করেছেন।

‘দ্য লেডি ফ্রম সাংহাই’ ছবির শেষ অংশে রয়েছে একটি অ্যামিউজমেন্ট পার্কের দৃশ্য—যার মিনিট তিনেক এখন এই ছবিতে দেখা যায়। এখনও দেখলে চমকে যেতে হয় সেই দৃশ্যের কারসাজি। ওয়েলস এই দৃশ্য কুড়ি মিনিট ছবিতে রেখেছিলেন, যা স্রেফ এডিট করে ফেলে দেওয়া হয়। সবচেয়ে ভয়ানক অবস্থা হয়েছিল এর বহুবছর পর নির্মিত মাইলস্টোন ছবি, ‘টাচ অফ ইভিল’-এর। এ ছবি নিয়ে পরে সাক্ষাৎকারে ওয়েলস বলেছেন, ওঁর প্রায় কাতর প্রার্থনা সত্ত্বেও এডিটিং রুমে তাঁকে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। নিজেদের মর্জিমতো সে ছবি এডিট করেন প্রযোজকরা—ওয়েলস বাধ্য হয়ে ৬৫ পাতার একটা ‘মেমো’ রেখে গিয়েছিলেন, কীভাবে সে ছবি এডিট করা উচিৎ, তাঁর বিশদ নির্দেশ লিখিত ছিল। সেসব বস্তুত মানা হয়নি।

তাঁর মৃত্যুর এক দশক পর বিখ্যাত ফিল্ম এডিটর ওয়াল্টার মার্চ সে ছবি ওয়েলসের নির্দেশ মতো আবার এডিট করেছিলেন।

যেমন উথালপাথাল কর্মজীবন, তেমনই ঘটনাবহুল ব্যক্তিগত জীবন কাটিয়েছিলেন অরসন ওয়েলস। মাত্র উনিশ বছর বয়সেই প্রথম বিয়ে করেন অভিনেত্রী ভার্জিনিয়া নিকোলসনকে। বিয়ের তিন মাসের মধ্যেই ভার্জিনিয়া জানতে পারেন, ওয়েলস আরেকটি প্রেমে জড়িয়েছেন, ফল তৎক্ষনাৎ ডিভোর্স। ওয়েলসের নানা প্রেম ও সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত অভিনেত্রী রিটা হেওয়ার্থের সাথে প্রেম এবং বিয়ের কয়েকটা বছর। ‘৪৩য়ে ওঁদের প্রথম দেখা, তুমুল প্রেমের পর এক ছবির শ্যুটিং-এর মাঝে ব্রেকে বিয়ে সেরে ফেলেন রিটা আর অরসন। পরিচালক আর অভিনেত্রীর প্রেম সিনেমার ইতিহাসে কম নয়। কিন্তু অরসন আর রিটা’র প্রেমকে বলা চলে একেবারে প্রথমদিকের একটি সংস্করণ। পরবর্তীকালে সিনেমার ইতিহাসে বিখ্যাত কিছু কাপল—জঁ লুক গোদার-আনা করিনা, আন্তোনিওনি-মনিকা ভিত্তি, ইংমার বার্গম্যান-লিভ উলম্যান—এঁদের জন্য প্রায় একটি মডেল সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন অরসন-রিটা।

তারপর? শুনুন…

লেখা: সায়ন্তন দত্ত
পাঠ: সুশোভন প্রামাণিক
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল