ব্যাটলফিল্ড নন্দীগ্রামে এই ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ বিচারকের রায়ের দিকেই মুখ চেয়ে যুযুধান দুই রাজনৈতিক পক্ষ

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: March 31, 2021 4:19 pm|    Updated: March 31, 2021 4:22 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: March 31, 2021 4:19 pm Updated: March 31, 2021 4:22 pm

তিনি নন্দীগ্রাম-এর একমেবাদ্বিতীয়ম বিচারক। আজ তিনি চিন্তান্বিত। তাঁর কাছে সুবিচারের আশায় আপিল করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও আর তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ শুভেন্দু অধিকারী দু’জনেই! এমনকী, মুখ্যমন্ত্রী এই মুহুর্তে নিজের ডেরাও বেঁধেছেন বিচারকের বাড়ির কয়েকশো মিটারের মধ্যেই! এবার ন্যায়াধীশ কোন পক্ষে রায় দেবেন? তিনি পড়েছেন মহা ফাঁপরে!

হাই ভোল্টেজ ‘নন্দীগ্রাম’। বাঙালির রোম খাড়া করে দেওয়ার জন্য এই একটি শব্দবন্ধই যথেষ্ট। রাজনীতির সবচেয়ে বড় ডুয়েলের জন্য গত কয়েক মাস এই জনপদ এখন সংবাদ শিরোনামে। এমনই নজরকাড়া কেন্দ্র যাকে নিয়ে শুধু রাজ্যের নয়, দেশের নয়, বিদেশের মানুষেরও আগ্রহ চরমে। আক্ষরিক অর্থেই নন্দীগ্রাম আপাতত একটা ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড’।

এতদিন ধরে যিনি নন্দীগ্রামের মানুষের সুবিচার করে আসছেন, আজ তাঁকে ধরেই টানাটানি শুরু হয়েছে। কে তিনি?

তাঁর নিবাস নন্দীগ্রাম ২ নং ব্লকের রেয়াপাড়া গ্রামে৷ হিজলি টাইডাল ক্যানেলের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত ছোট্ট ঝুট ঝামেলাহীন একটি গ্রাম৷ দিঘা-হাওড়া রুটের বাস চেপে চণ্ডীপুর মোড়ে নেমে অটোতে মিনিট পনেরোর রাস্তা। স্টপেজের নাম শিবমন্দির। পাকা রাস্তা থেকে বামদিকে একটা রাস্তা চলে গিয়েছে। সামনেই মন্দিরের দিকনির্দেশকারী কারুকার্যমণ্ডিত একটা বড় গেট। সেই রাস্তা ধরে মিনিট পনেরো হাঁটলেই গাছপালার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ে মন্দিরের চূড়া৷ শ্ৰীশ্ৰী মহারুদ্র সিদ্ধনাথ জীউর মন্দির। হ্যাঁ, এই সেই মন্দির যেখানে পুজো না দিয়ে বড় বড় প্রাজ্ঞ রাজনীতিকরাও কোনও কাজে বের হন না। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেই হোন না কেন! হবে না-ই বা কেন? এই মন্দিরের সৃষ্টিও যে রহস্যময়!

এই মন্দিরের সৃষ্টিরহস্য জানতে গেলে আমাদের কয়েক শতক পিছিয়ে যেতে হবে। তখন রেয়াপাড়া গ্রামটি কোথায়! সমুদ্রতীরবর্তী ঘন জঙ্গলে ঢাকা একটি নামহীন দ্বীপের মতো ছিল এই অঞ্চল। জনশ্রুতি, সমুদ্রতীরবর্তী এই পথে চন্দন সওদাগর নামক বণিক সাত ডিঙা বোঝাই মালপত্র নিয়ে বাণিজ্য যাত্রা করছিলেন। পথে প্রচণ্ড পিপাসার কারণে এই রেয়াপাড়া ঘাটে নোঙর করতে বাধ্য হন। ভৃত্যকে জলের সন্ধানে পাঠালেন। সে জলের অন্বেষণে খানিকটা গিয়ে একটি কুয়োর সন্ধান পায়। সেখানে পিতলের পাত্রে জল তোলার পর সেটা সোনার পাত্রে পরিণত হয়! এই ঘটনা শুনে অবাক সওদাগর জায়গাটি স্বচক্ষে এবং সরেজমিনে দেখতে আসেন। সেখানে এসে তিনি একটি শিব বিগ্রহের সন্ধান পান। তিনি সাতদিনের মধ্যে এখানে সেই বিগ্রহকে কেন্দ্র করে একটি মন্দির তৈরি করেন।

১৯৮৭ সালে প্রকাশিত তারাপদ সাঁতরা ‘পুরাকীর্তি সমীক্ষা’ বইতে লিখেছেন, মন্দিরটিতে পাল-সেন আমলের একটি পাথরের বিষ্ণুমূর্তি রয়েছে। এখন সেই মূর্তির আর খোঁজ পাওয়া যায় না। বর্তমানে মন্দিরটি সংস্কারের ফলে প্রাচীনতার কোনও ছাপ নেই। অতীতে তাম্রলিপ্ত বন্দরের সন্নিকটস্থ রেয়াপাড়ার কাছেই ছিল জাহাজ বাঁধার ঘাট। কয়েক দশক আগে রেয়াপাড়ায় পুকুর খনন করতে গিয়ে জাহাজ বাঁধার শিকল, মাস্তুলের ভগ্নাংশ, জাহাজের টুকরো টুকরো অংশের সন্ধান পাওয়া যায়।

মেদিনীপুরের কর্ণগড়ের রাজা যশবন্ত সিংহর রাজসভার কবি রমেশ্বর ভট্টাচার্য ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে শিব-সংকীর্তন গীতিকাব্য লিখেছিলেন। এই গীতিকাব্যে রেয়াপাড়াকে তিনি একটি পোতাশ্রয় হিসাবে উল্লেখ করেছিলেন। তখন কি তিনি থোড়াই জানতেন যে ভবিষ্যতে এই বন্দরই ভার্চুয়াল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হবে! জানলে গীতিকাব্যের বদলে তিনি নতুন ‘মহাভারত’ লিখতেন।

শুনুন…

লেখা: সৌমেন জানা
পাঠ: সুশোভন প্রামাণিক
আবহ: শুভাশিস চক্রবর্তী

পোল