কবে থামবে কু-কথার রাজনীতি, রাজনীতিতে কু-কথার ফুলঝুরি! বঙ্গের ভোটরঙ্গে রাজনীতির ভাষা, ভাষার রাজনীতির একটি খতিয়ান

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 14, 2021 5:12 pm|    Updated: April 14, 2021 5:20 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 14, 2021 5:12 pm Updated: April 14, 2021 5:20 pm

আপাত ঔদ্ধত্য এবং কদর্যতার এই সীমাহীন প্রদর্শন কারও কাছে নতুন ঠেকলেও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সময় যিনি অন্তত টেলিভিশন-সোশ্যাল মিডিয়া’র নিয়মিত দর্শক, তাঁর কাছে বহু ব্যপ্ত নকশি কাঁথার কিছু নকশা বলেই এসবকে মনে হবে। ‘নকশা’ বহুলার্থে, উনিশ শতকীয় প্রহসন অর্থে এবং শিল্পময় কারুকার্য অর্থেও।

এই আচরণ থেকে একটু দূরত্ব নিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে বসলে আপাতভাবে কয়েকটা বৈশিষ্ট্য আমাদের চোখে পড়ে। বোঝা যায়, পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতির ‘ভাষা’ নামক যে জিনিসটি—তার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ যে ভাষায় মাঠে-ঘাটে-জনসভা বা টেলিভিশনের পর্দায় রাজনীতি হয়, অধিকাংশ সময়েই সেই ভাষা থেকে এককালীন ‘শিষ্টতা’, ‘শালীনতা’, ‘সৌজন্য’—ইত্যাদি যে সর্বজনগ্রাহ্য যেসব বিধি হিসেবে ধরা হতো, তার প্রয়োজন বোধহয় সম্পূর্ণ ভাবে ফুরিয়েছে। অর্থাৎ একসময়ের রাজনীতিতে ‘রাজনীতির ভাষা’ সর্বত্রই যে ‘ভদ্রতা’র মাপকাঠিতে বিচার্য হত, তার আমূল পরিবর্তন হয়েছে—ভাষার জগতে অন্য কোনও একটি দিকের বিকাশ ঘটছে।

এখন খুব সহজে এর নিন্দে করা যায়—বলে দেওয়া যায় এহ, সবাই কী অভদ্র দেখুন! কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না, ‘ভদ্রতা’, ‘শিষ্টতা’, ‘শালীনতা’—এই শ্রেণীবিভাগগুলির দেশ-কাল নির্বিশেষে, ইতিহাস নির্বিশেষে কোনো সর্বজনগ্রাহ্য ‘সংজ্ঞা’ হতে পারে না। এমনটা হতেই পারে, ইতিহাসের এক পর্বের মানুষের কাছে যা ছিল ‘ভদ্রতা’র পরিচায়ক—আরেক শ্রেণীর মানুষের কাছে তাই হয়তো ‘অভদ্রতা’। হতেই পারে, সাংস্কৃতিক উপাদানের যে রুচিকে এককালীন মানুষ মনে করতেন অভদ্র, লারেলাপ্পা, তাই হয়তো দুই-তিন দশক পরে অতটাও অভদ্র, অতটাও কুরুচিকর বলে সমাজ আর মনে করল না–তাই ‘অভদ্রতা’ আর ‘ভদ্রতা’র মধ্যে কোনো কঠোর কাঁটাতারের বেড়া নেই।

বলা বাহুল্য—‘ভদ্রতা’ নানা চিহ্নগুলো নিয়ে এই জাতীয় ঘটনায় নতুন করে তলিয়ে ভাবতে হয়। একথা ঠিক, দীর্ঘদিন পর্যন্ত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর মানুষের একচ্ছত্র অধিপত্য চলেছে অন্যান্য সমস্ত জায়গার মতো রাজনীতির ক্ষেত্রেও। কলকাতার বাবু ভদ্রলোকের মতো ভাষা ব্যবহার করতে পারলেই কেউ সম্মানের যোগ্য—এমন অকথিত অহমিকা দীর্ঘদিন আমরা দেখেছি রাজনীতির ময়দানে। মনে পড়ে, বহু আগে এ রাজ্যের এক ‘পারফেক্ট ভদ্রলোক’ মুখ্যমন্ত্রী প্রধান বিরোধী নেত্রী সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে নাক কুঁচকে বলেছিলেন, তাঁর সম্পর্কে কথা বলতে নাকি তাঁর ‘ভদ্রলোকচিত রুচিতে বাধে’! ভদ্রতার এহেন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আস্ফালন—যা আদতে সরাসরি কদর্যতার চেয়ে কোনও অংশেই কম অসম্মানজনক নয়—আমরা রাজনীতির ভাষায় কম দেখিনি। সুদূর গ্রাম মফস্‌সল থেকে আসা সবাইকে কলকাতার ভদ্রলোকের ভাষায় কথা বলতে হবে, এমনটা কে ঠিক করে দিল?

এহেন ভদ্রলোকের কথিত-অকথিত আধিপত্য আজকাল রাজনীতির দুনিয়া থেকে ক্রমশঃ মিলিয়ে যাচ্ছে। মুশকিল এই, এক কালে যেমন ভদ্রলোক মানেই আমরা ‘ভালো’ ভেবে বসতাম, তেমন আজকাল কিছু প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা কিছু ‘ভদ্রলোকি আচারবিধি’র মধ্যে পড়ে না—তাই যেন গতানুগতিক ভালো—কারণ, ঐ যে, ভদ্রলোকের একাধিপত্য খারাপ। মজা হল, রাজনৈতিক নেতাদের রুমাল বেড়ালের মত তো আর রাজনীতির ভাষার নির্দিষ্ট অর্থে ভালো-খারাপ এরকম হয় না—সাদা বা কালো, এরকম একেবারে বৈপরীত্যের আভাস এখানে নেই। তাই ভদ্রলোকের আধিপত্য খারাপ মানেই যে অ-ভদ্রলোক সুলভ আচার আচরণ ভালো হবে—এমন তো কোনো মানে নেই! বিশেষত সেই অ-ভদ্রলোক সুলভ আচার আচরণ যখন সরাসরি হুমকি, ব্যক্তি-আক্রমণ, পারস্পরিক কুৎসা, এবং ক্ষেত্র বিশেষে ভাষার পিতৃতান্ত্রিক ব্যবহারের যথেচ্ছ উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে!

শুনুন…

লেখা: সায়ন্তন দত্ত
পাঠ: অনুরণ সেনগুপ্ত
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল