বাংলার এই রাজবাড়ির সঙ্গে জুড়ে আছে মুঘল প্রেমগাথা-বর্গী আক্রমণ, ব্রিটিশ আমলে এখানে লুকিয়ে ছিলেন কাজী নজরুল, হেতমপুরের হাজারদুয়ারির নানা অজানা কাহিনি

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 5, 2021 10:38 pm|    Updated: April 5, 2021 10:46 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 5, 2021 10:38 pm Updated: April 5, 2021 10:46 pm

কেবল রাজ ইতিহাসই কাফি নয়, আড়ালে-আবডালে রয়েছে আরও বহু কথা। সরাসরি স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত ছিল এই হেতমপুর রাজবাড়ি! টুকরো ইতিহাস জানাচ্ছে, স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল পর্বে এই রাজবাড়িরই একটি ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম আর চারণকবি মুকুন্দদাস! ব্রিটিশদের রোষে বন্দি হয়ে কারারুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা ছিল দুজনেরই। ব্রিটিশ প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এই রাজবাড়িরই দোতলার একটি ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন নজরুল ইসলাম! যদিও শেষপর্যন্ত ধরা পড়ে যান। শোনা যায় বহরমপুরের জেল থেকে হেতমপুর রাজবাড়ি নিয়ে নাকি কবিতাও লেখেন নজরুল! কেবল নজরুল বা মুকুন্দদাস’ই নন, পরবর্তীতে আরও অনেক সমাজকর্মী ও স্বাধীনতা সংগ্রামীরাই আশ্রয় নিয়েছেন এই রাজবাড়িতে। শুধু স্বাধীনতা সংগ্রামীরাই নন, বহু ব্রিটিশ অফিসারও নাকি নিশ্চিন্তে এই রাজবাড়ির আশ্রয়েই তৈরি করেছেন নানারকম হত্যার ব্লু-প্রিন্ট! কাহাবত তো থাকবেই, তার মধ্যে থেকে ইতিহাসের নির্যাসটুকু শুষে নিলে জানা যায়, ৪৭ পরবর্তী স্বাধীনতা পর্বে এই হেতমপুরের রাজা ছিলেন বিশ্বরঞ্জন চক্রবর্তী। এই রাজবাড়ি থেকেই বীরভূম জেলার প্রথম পতাকা উত্তোলিত হয়!

হেতমপুর নামকরণের পূর্ব ইতিহাসের দিকে যদি ফিরে দেখি। তাহলে সেখানে লুকিয়ে আছে এক প্রেম কাহিনি।

একসময় হেতমপুরের নাম ছিল রাঘবপুর। জমিদার রাঘব রায়ের নামানুসারেই এই জায়গায় নাম। রাঘব রায় ছিলেন নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর অধীনস্থ জমিদার। পরবর্তীতে হেতমপুরে ক্ষমতায় আসেন হাতেম খাঁ। হাতেম খাঁর নাম অনুযায়ী জায়গার নাম হয় হাতেমপুর এবং একটু একটু করে লোকমুখে উচ্চারণের অপভ্রংশে যা হয়ে ওঠে ‘হেতমপুর’। এই হেতমপুর রাজবাড়ি থেকেই কয়েক কিলোমিটার এগলে এক পাণ্ডববর্জিত এলাকায় পড়ে শেরিণা বিবির মাজার বা দরগা। চারদিকে ঘন গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের মাঝে যে এমন একখানা মাজার থাকতে পারে, তা স্থানীয় মানুষ ছাড়া অন্যের পক্ষে সহজে বোঝা মুশকিল। কে এই শেরিণা বিবি?

ইতিহাস বলছে, ইনি হলেন মোগল বাদশা ঔরঙ্গজেবের নাতনি। বাদশাহের রাজসভার এক সেনাপতিকে ভালোবেসে চলে আসেন হেতমপুরে।! আদতে শেরিণা বিবি নয়, দিল্লির আমিনা বিবি, ওসমানের প্রেমে পড়েছিলেন। ওসমান ছিলেন সামান্য এক সৈনিক। সম্ভ্রান্ত হোসেন খাঁ’র সঙ্গে বিবাহ নির্ধারিত হলেও আমিনা বিবি লুকিয়ে পালিয়ে আসেন, সঙ্গে ওসমান। হাতেম খাঁর কাছে তাঁরা দুজনেই আশ্রয় লাভ করেন। নিজেদের পরিচয় দেন হাফেজ খাঁ ও শেরিণা বিবি নামে। হাতেম খাঁর কোনো সন্তান ছিল না, এই দু-জনের প্রতি তাঁর নানা কারণে অপত্য স্নেহ জন্মেছিল। যদিও হাতেম খাঁর কাছে নিজেদের আসল পরিচয় তাঁরা দুজনেই পরে প্রকাশ করেছিলেন। মৃত্যুকালে হাতেম খাঁ তাঁর সমস্ত সম্পত্তি দিয়ে যান এই দুজনকে।

হোসেন খাঁও চুপ করে থাকার পাত্র নন। তিনি ছদ্মবেশে ভারতের নানা জনপদে তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকেন আমিনা বিবিকে। অবশেষে ফকিরের ছদ্মবেশে হেতমপুরে সন্ধান পান তাঁদের। হেতমপুর ততদিনে বর্গি আক্রমণে বিপর্যস্ত! সুযোগ বুঝে বর্গি নেতা ভাস্কর পণ্ডিতের শরণাপন্ন হন হোসেন খাঁ। হঠাৎ এক রাতে হেতমপুর আক্রমণ করে বর্গিরা! সতর্ক থাকলেও শেষ রক্ষা হয়নি। হাফেজ খাঁ এই যুদ্ধে নিহত হন। সদ্য প্রসূতা হয়েও বীরের মতো যুদ্ধ করেন শেরিণা বিবি! একটা সময় থেমে যায় লড়াই‌। অসহায় আমিনা বিবি শিশুপুত্রকে বুকে জড়িয়ে ঝাঁপ দেন পুকুরে। শেষ হয় তাঁদের সম্পর্ক এবং প্রতিশোধের আখ্যান।

লেখা: বিতান দে
পাঠ: কোরক সামন্ত
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল