‘মুহুর্মুহু আমি বেঁচে থাকি বাংলাদেশের মধ্যেই’, কৈশোরে ছেড়ে আসা দেশের স্মৃতি শঙ্খ ঘোষ আজীবন বুনেছেন কবিতায়-আখ্যানে

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 23, 2021 12:04 am|    Updated: May 8, 2021 11:07 am

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 23, 2021 12:04 am Updated: May 8, 2021 11:07 am

শঙ্খ ঘোষ নিজের বিশেষ স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনী লেখেননি। কিন্তু নীলুর এই আশ্চর্য কৈশোরের গল্পেই যেন ধরা দেন তিনি। উপন্যাসে বাসুদি নামের এক চরিত্র নীলুকে চিঠিতে লিখেছিল বন্ধু বরুণকে নিয়ে তার শ্বশুরবাড়িতে যেতে। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না।

এই চিঠির পর নতুন পরিচ্ছেদ শুরু—“আজ চলে যাবে বরুণরা। তখনো অন্ধকার রয়ে গেছে, নীলমাধব চলেছে মাঠের ওপর দিয়ে, যেমন আগে আগে যেত পদ্মার জন্য।’’

দুটো ভোর কত আলাদা! ব্রিজের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে রেলগাড়ি। তিনজন মিলে ওপারে চলে যাবার কথা ছিল। যুদ্ধের সময় ব্রিজে ওঠার নিয়ম নেই। উপন্যাসটি শেষ হচ্ছে নীলুর আত্মোপলব্ধি’তে—“কেশব কবে চলে গেছে। বরুণও চলে গেল। হয়তো একদিন যুদ্ধও থেমে যাবে। তখন একদিন নীলু ওই ব্রিজের ওপর দিয়ে চলে যেতে পারবে ওপারের দিকে। কিন্তু তখন কেশব থাকবে না, বরুণ থাকবে না। যেতে হবে একলা, একেবারে একা!’’

এই আখ্যানটির মূল রচনার সময় উল্লিখিত ১৯৬৪। এর কিছু আগে পরের সময় ঘিরে লেখা হবে ‘নিহিত পাতালছায়া’, ‘তুমি তো তেমন গৌরী নও’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি। দু’ একটি কবিতার মধ্যে অতর্কিতে যেন উঁকি দিয়ে যায় নীলুর সেই যন্ত্রণা, কবিতার অন্তরালে বেজে চলে বিচ্ছেদের সেই করুণ সুর। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘আদিম লতাগুল্মময়’ কাব্যগ্রন্থের ‘অঞ্জলি’ কবিতাটির কথা ধরা যাক, ফেলে আসা পদ্মাতীরের প্রিয়জন হারানোর আজন্ম ক্ষত হয়ে লেখা হয় এই লাইনগুলি —

“ঘর যায় পথ যায় প্রিয় যায় পরিচিত যায়

সমস্ত মিলায়

এমন মুহূর্ত আসে যেন তুমি একা

দাঁড়িয়েছ মুহূর্তের টিলার উপরে, আর জল

সব ধারে ধাবমান জল…’’

‘সকালবেলার আলো’ আখ্যানের কিছুদিন পরের ছবি বর্ণিত হয়েছে ‘সুপুরিবনের সারি’ উপন্যাসে। স্বাধীনতার পর দেশ দু-টুকরো হয়ে গেছে। পুজোর ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছে নীলু। বাড়ি বলতে নীলু মামাবাড়িকেই বোঝে। তার ঠাকুরদা আর দাদামশাই-এর বাড়ি একই গ্রামে। অন্যবারের থেকে এবারের যাওয়া আলাদা ঠেকে নীলুর কাছে—

“যাবে না কেউ এবার, কেননা দেশ নাকী এবার ভাগ হয়ে গেছে। নীলুদের গ্রামটা না কি এখন অন্য একটা দেশ। ভারি আজব কথা। এখন না কি তাই ভিন্ন কোথাও থাকতে হবে তাদের। কোথায়? কেউ ঠিক জানে না এখনো।… বড়মামাদের কথা শুনে বুঝে নিয়েছে নীলু, এবার তারা যাচ্ছে, আর কোনোদিন দেশে না যাবার জন্য।’’

দেশভাগ নিয়ে অযুত গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে, কিন্তু এমন সরল ভাষায় মানচিত্র ভাগের এই অঙ্ককে প্রশ্ন করতে পারেন একমাত্র শঙ্খ ঘোষ।

সেই ভাগের ভাগশেষ হয়ে কেটেছে তাঁর জীবন, আজন্ম সেই ভাগশেষ বহন করেছেন তিনি।

শুনুন…

লেখা: সানু ঘোষ
পাঠ: শঙ্খ বিশ্বাস
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল