তিব্বতি রাজা স্রং সন, রাজা শশাঙ্ক, সুলতান হোসেন শাহ্ এবং সম্রাট আকবর, বঙ্গাব্দের জন্মবৃত্তান্তে রয়েছে অন্তত চারজন শাসকের দাবি

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 15, 2021 7:11 pm|    Updated: May 8, 2021 11:11 am

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 15, 2021 7:11 pm Updated: May 8, 2021 11:11 am

ফরাসি পণ্ডিত সিলভ্যাঁ লেভির মতে তিব্বতীয় রাজা স্রং সনএর থেকেই এসেছে বাংলাসনলে নেপালনামক বইটি থেকে জানা যায়, রাজা স্রং সন ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে মধ্য পূর্বভারত জয় করেন। তাঁর নামেরসনথেকেই বাংলা সন শব্দ যুক্ত করে নাকি বঙ্গাব্দ প্রচলিত হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার, সন কিংবা সালশব্দ দুটি বাংলা কিংবা তিব্বতি কোনটিই নয়। প্রথমটি আরবি এবং দ্বিতীয়টি ফারসি। কাজেই তিব্বতি রাজার গল্প যুক্তির ক্ষেত্রে বিশেষ জোর পায় না।

বঙ্গাব্দ নিয়ে দ্বিতীয় মতবাদটি গৌড়েশ্বর রাজা শশাঙ্ককে কেন্দ্র করে।বঙ্গাব্দের উৎসকথাবইয়ে সুনীলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই এপ্রিল থেকে নাকি বঙ্গাব্দের গণনা শুরু হয়। কারণ সেদিনই নাকি শশাঙ্ক সিংহাসনে আরোহন করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের প্রামাণ্য তথ্য বলছে শশাঙ্কের সময়কাল আনুমানিক ৬০০ থেকে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ। এর প্রায় এক হাজার বছর আগে কিংবা পরের সময়কালের মধ্যে কোথাও বঙ্গাব্দের উল্লেখ মেলে না। এমনকি শশাঙ্কের অধীনস্থ মাধব বর্মণএর লেখাগঞ্জাম লেখতে রয়েছেগুপ্তাব্দএর ব্যবহার। প্রশ্ন জাগে বঙ্গব্দের প্রচলন যদি শশাঙ্কই করতেন, তবে তাঁর নির্দেশে লিখিত লেখতে বঙ্গাব্দ না হয়ে গুপ্তাব্দ উল্লিখিত হল কেন? এই ধোঁয়াশাই বঙ্গাব্দের জন্মকথায় গৌড়েশ্বরের ভূমিকাকে নিঃসন্দেহ হতে দেয় না।

বঙ্গাব্দ নিয়ে তৃতীয় মতবাদের নায়ক বাংলার মুসলমান শাসক সুলতান হোসেন শাহ্‌, গবেষক যতীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মতে হোসেন শাহ্‌’ আমল থেকে শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সাহিত্যে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাতন্ত্র্য এবং জাতীয়তাবাদের জাগরণ শুরু হয়, কিন্তু তাতেই এই শাসকরা নিজস্ব অব্দ রীতির প্রচলন করেছিলেন কিনা তা নিয়েও নিঃসংশয় হওয়া যায় না।

বাংলা সনের উদ্ভব নিয়ে সবথেকে জনপ্রিয় ধারণায় যুক্ত রয়েছে মুঘল বাদশাহ্সম্রাট আকবরের নাম। সম্রাট আকবর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে জয়লাভ করে দিল্লির সিংহাসনে বসেন। হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে সময়কাল ছিল ৯৬৩ সন। সেই অনুসারে আজ থেকে ৪৫৬ বছর আগে আকবরের সিংহাসন লাভের ঘটনার সঙ্গে হিজরি সালের সামঞ্জস্য বিধান করলেই বেরিয়ে আসে বঙ্গাব্দের হিসেব। সহজভাবে বলতে গেলে, আকবর সিংহাসনে অভিষিক্ত হয়েছিলেন যত বছর আগে, অর্থাৎ ৪৬৫ বছরএর সঙ্গে সেই সময়ের হিজরি সন ৯৬৩ যোগ করলেই যোগফল হয় ১৪২৮, যে বঙ্গাব্দ শুরু হয়েছে এবং চলবে আপাতত একটি বছর।

কাজেই বঙ্গাব্দের প্রচলনে সম্রাট আকবরের দাবি খুব সহজে নস্যাৎ করা যায় না। গবেষকদের মতে শাসন পরিচালনা এবং রাজস্ব আদায় সহজ করার জন্য গোটা সাম্রাজ্যকে কয়েকটি ভাগে আকবর ভাগ করেছিলেন। টোডরমলের তত্ত্বাবধানে প্রবর্তিত হয়েছিল নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা, যার নাম ছিল দশসালা বন্দোবস্ত। এই সময়েই ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে নতুন সনের সূচনা ঘটে জ্যোতির্বিদ আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজীর তত্ত্বাবধানে। আকবরের প্রবর্তিত এই নতুন সন পরিচিতি পায়ইলাহি সনহিসাবে। হিজরি সন পুরোপুরি চন্দ্র নির্ভর হবার কারণে ভারতের ঋতুর সাথে তা মিলত না। রাজস্ব আদায়েও অসুবিধা হতো। এজন্য মাসগুলোকে চন্দ্রনির্ভর রেখে বছরকে সৌর করে ঋতুর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া হয়।

১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রবর্তিত হলেও এই ইলাহি সনের শুরু ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দেই। কাজেই বঙ্গাব্দকে পরিবর্তিত ইলাহি সন হিসেবে অনেকেই ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু ইলাহি সনে মাসের নাম ছিল ফারসিতে। সেখানে বাংলা মাসগুলির নাম শকাব্দের অনুসরণে জ্যোতিষশাস্ত্রের ২৭ নক্ষত্র মণ্ডলের ১২ টি নক্ষত্রের নামে। যেমনজ্যেষ্ঠাথেকে জৈষ্ঠ্য, ‘মঘাথেকেমাঘ’, ‘শ্রবনাথেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপদ থেকেভাদ্রইত্যাদি।

যদিও অনেক ঐতিহাসিকের মতে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য আকবর যে ইলাহি সনের প্রবর্তন করেছিলেন সেই সনকে ভিত্তি ধরে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্যই মুর্শিদকুলী খাঁ আমলে জন্ম হয় বাংলা সনের। ইলাহি সন থেকে উৎপত্তি ঘটলেও বাংলা সালের মাস এবং দিনের নামগুলি তাই পূর্বপ্রচলিত শকাব্দ থেকেই নেওয়া হয়েছে।

এরপর আধুনিককালে বঙ্গাব্দের ইতিহাস জুড়ে গিয়েছে বাঙালির আত্মপরিচয়ের সঙ্গে। দেশভাগ বাঙালিকে দ্বিখণ্ডিত করলেও বাঙালি তাঁর নিজস্ব অব্দসনকে জুড়ে রেখেছিল নিজের আত্মার সঙ্গে। ১৯৫২ সালে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা এবং তাঁর কমিটি ভারতের অন্যান্য সালের সাথে বাংলা সন সংস্কারের প্রস্তাব করেন। ভারত সরকার তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করেন ১৯৫৭ সালে। ১৯৬৩ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গঠিত হয় বাংলা ক্যালেন্ডার সংস্কার কমিটি। বাংলার নববর্ষ, বাঙালির নববর্ষকে যারা সাম্প্রদায়িক মাত্রায় বিভাজিত করে দেন তারা হয়তো ভুলে যান বাংলা ক্যালেন্ডার সংস্কার কমিটির প্রধান ছিলেন . মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ধর্ম পরিচয়ে তিনি মুসলমান, কিন্তু জাতিগত পরিচয়ে তিনি বাঙালি। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের পর তাজউদ্দিন আহমদ সরকারি নথিতে বাংলা তারিখের প্রথা চালু করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে তা আরও দৃঢ় হয়। অবশেষে ১৯৮৭ সাল থেকে সে দেশে সরকারি কাজে খ্রিস্টাব্দ ব্যবহারের পাশাপাশি বাংলা সন লেখার সরকারি নির্দেশনা চালু হয়।

তারপর শুনুন

লেখা: সানু ঘোষ
পাঠ: শঙ্খ বিশ্বাস
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল