ব্রাহ্ম হওয়া সত্বেও রবীন্দ্রনাথের গভীর অনুরক্তি ছিল খ্রিস্টের প্রতি, শান্তিনিকেতনে শুরু করেছিলেন খ্রিস্ট উৎসব

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 7, 2021 5:58 pm|    Updated: April 7, 2021 6:00 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 7, 2021 5:58 pm Updated: April 7, 2021 6:00 pm

পিতা মহর্ষির মৃত্যু হয়েছে ১৯০৫-এ, ধর্মের নামে পরিবারের তরফে থাকা শৃঙ্খলটুকুও গিয়েছে খুলে— শান্তিনিকেতনে তখন শুরু হয়েছে নতুনের কর্মযজ্ঞ— ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ নাম পাল্টে হয়েছে ‘বিশ্বভারতী’, বিশ্ব যেখানে এসে মিলে যাবে ভারতের সঙ্গে— রবীন্দ্রনাথ সেখানেই শুরু করলেন, ‘খৃস্টোৎসব’। আশ্রমের পৌষ উৎসবের সঙ্গেই মিশে গেলো যিশুর জন্মোৎসব—শুরু হল শান্তিনিকেতনের ‘বড়োদিন। ঔপনিষদিক আর খ্রিস্টিয় ভাবনার এক আশ্চর্য মেলবন্ধনে উপনিষদের মন্ত্রের সাথেই গাওয়া হতে লাগল খ্রিস্টিয় গান, পাঠ হল বাইবেল।

১৯১০-এ শুরু, তারপর থেকে প্রতিবছর উপসনাগৃহে আয়োজন হয়, হতো খৃস্টোৎসবের। আশ্রমিক অজিতকুমার চক্রবর্তীকে দিয়ে এই উপলক্ষে কবি লিখিয়েছিলেন ‘খ্রিস্ট’ নামের একটি বই। বইয়ের শুরুর একটি নাতিদীর্ঘ ভূমিকায় যিশুর জীবনের মূল কথাটি তুলে ধরে ‘বড়োদিন’ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘‘আজ পরিতাপ করার দিন, আনন্দ করবার নয়। … বড়োদিন নিজেকে পরীক্ষা করবার দিন, নিজেকে নম্র করবার দিন।’’

শান্তিনিকেতনের তো বটেই এমনকি ভারতবর্ষের বাইরে বিদেশের মাটিতে থাকলেও পৌষ উৎসব ও খ্রিস্ট উৎসবের জন্য কবির মন নিবিড় ভাবে আচ্ছন্ন হয়ে থাকত। খ্রিস্ট উৎসব প্রসঙ্গে এমনই এক আনন্দপূর্ণ বয়ান পাওয়া যায় ১৯১২ সালের বড়দিনে, আমেরিকার ইলিনয় থেকে হেমলতা দেবীকে লেখা এক চিঠিতে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘‘আজ খৃস্টমাস। এইমাত্র ভোরের বেলা আমরা আমাদের খৃস্টোৎসব সমাধা করে উঠেছি। আমাদের শোবার ঘরে একটি কোণে আমাদের উৎসব করলুম। কিছু অভাব বোধ হল না। উৎসবের যিনি দেবতা তিনি যদি আসন গ্রহণ করেন তাহলে কোনও আয়োজনের ত্রুটি চোখে পড়েই না। তাঁকে আজ আমরা প্রণাম করেছি, তাঁর আশীর্বাদ আমরা গ্রহণ করেছি।’’

কিন্তু প্রশ্ন জাগে রবীন্দ্রনাথের চেতনায় যিশুর অবস্থান, খ্রিস্ট আকর্ষণ কেন এমন অমোঘ হয়ে উঠেছিল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের লেখাতেই। যিশু তাঁর কাছে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রচারক নন, বরং মানুষকে ভালোবাসার দীক্ষা দেওয়া এক মহতি চরিত্র হলেন যিশু— ‘যিশুচরিত’ লেখায় রবীন্দ্রনাথ তাই বলছেন,

‘যিশু চরিত্র আলোচনা করিলে দেখিতে পাইব, যাহারা মহাত্মা, তাহারা সত্যকে অত্যন্ত সরল করিয়া সমস্ত জীবনের সামগ্রী করিয়া দেখেন, তাহারা কোনো নতুন পন্থা, কোনো বাহ্য প্রণালী, কোনো অদ্ভুত মত প্রচার করেন না। তাহারা অত্যন্ত সহজ কথা বলিবার জন্য আসেন।’

কিন্তু কী সেই সহজ কথা যাতে আকৃষ্ট হয়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ?

বাইবেলে এক জায়গায় যিশু বলেছেন, ‘যারা দীন তারা ধন্য কারণ স্বর্গরাজ্য তাদের, যারা নম্র তারা ধন্য কারণ পৃথিবীর অধিকার তারাই লাভ করবে।’ রবীন্দ্রনাথ এই কথাটিকে নিজের অন্তরে উপলব্ধি করে লিখেছিলেন, ‘এইভাবে স্বর্গরাজ্যকে যিশু মানুষের অন্তরের মধ্যে নির্দেশ করিয়া মানুষকেই বড়ো করিয়া দেখাইয়াছেন। তাহাকে বাহিরের উপকরণের মধ্যে স্থাপিত করিয়া দেখাইলে মানুষের বিশুদ্ধ গৌরব খর্ব হইত। তিনি আপনাকে বলিয়াছেন মানুষের পুত্র। মানব সন্তান যে  কে তাহাই তিনি প্রকাশ করিতে আসিয়াছেন।’

রবীন্দ্রনাথ আরও লিখছেন, ‘‘মানব সমাজে দাঁড়াইয়া ঈশ্বরকে তিনি পিতা বলিয়াছেন। পিতার সাথে পুত্রের যে সম্বন্ধ তাহা আত্মীয়তার নিকট সম্বন্ধ। আত্মা জায়তে পুত্র:। তাহা আদেশ পালনের ও অঙ্গীকার রক্ষার বাহ্য সম্পর্ক নহে। ঈশ্বর পিতা এই চিরন্তন সম্বন্ধের দ্বারাই মানুষ মহীয়ান, আর কিছু দ্বারা নহে। তাই ঈশ্বরের পুত্ররূপে মানুষ সকলের চেয়ে বড়, সম্রাজ্যের রাজা রূপে নহে। তাই শয়তান আসিয়া যখন বলিল, ‘তুমি রাজা’, তিনি বলিলেন, ‘না, আমি মানুষের পুত্র।’ এই বলিয়া তিনি সমস্ত মানুষকে সম্মানিত করেছেন।”

শুনুন

লেখা: সানু ঘোষ
পাঠ: কোরক সামন্ত
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল