রঙকানা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ অথচ তার কোনও প্রভাব তাঁর চিত্রকলায় পড়েনি

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: March 2, 2021 1:33 pm|    Updated: March 2, 2021 1:33 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: March 2, 2021 1:33 pm Updated: March 2, 2021 1:33 pm

আঠারোশো চুরানব্বই সালে ভাইজি ইন্দিরাকে লেখা তেমনই একটি চিঠির পাতা ওলটাতে গিয়ে নজরে আসবে আশ্চর্য এক কথা। বর্ণময় সূর্যাস্ত দেখে মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ লিখছেন,

“কত রকমেরই যে রং চতুর্দিকে ফুটে উঠেছিল সে আমার মতো সুবিখ্যাত রঙকানা লোকের পক্ষে বর্ণনা করতে বসা ধৃষ্টতামাত্র। কেবল আকাশে নয়, পদ্মার জলে এবং বালির চরেও কাল হঠাৎ রঙের ইন্দ্রজাল লেগে গিয়েছিল…’।

রবীন্দ্রনাথ, বাস্তবজীবনে ছিলেন রঙকানা— ছিন্নপত্রের এই চিঠিতেই রয়েছে, তাঁরই আত্ম-স্বীকারোক্তি।

রবীন্দ্রনাথ যে খানিকটা বর্ণান্ধ ছিলেন তা তাঁর জীবনের আরও নানা ঘটনা থেকেও বোঝা যায়। কবির খুব প্রিয় ফুল ছিল পলাশ। কিন্তু লাল রঙের ব্যাপারে তিনি ছিলেন বেশ কম সংবেদনশীল। তারচেয়ে সবুজ বা নীল রঙ তাঁকে ঢের বেশি আকৃষ্ট করতো। শুধু তাই নয়, সুবজের বিভিন্ন ‘শেড’ তিনি সহজেই সনাক্ত করতে পারতেন, এবং এই বিষয়ে তাঁর ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই ছিল সাধারণের চেয়ে বেশি। তাঁর কাছে সবুজের বৈচিত্র্য এতই বেশি ছিল প্রায়শই তাঁর মনে হত এত আলাদা আলাদা সবুজকে কীভাবে লোকে শুধু ‘সবুজ’ নামে ডাকে!

রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতার সরাসরি সাক্ষ্য পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের খুব কাছের এক মানুষের লেখায়। তিনি নির্মলকুমারী মহলানবিশ। তাঁর ‘বাইশে শ্রাবণ’ বইয়ের একটি লেখায় নির্মলকুমারী লিখেছেন,

‘পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছিল যে উনি রঙকানা ছিলেন। লাল রঙটা চোখে পড়তো না, মানে লাল আর সবুজের বেশী পার্থক্য বুঝতে পারতেন না। কিন্তু কোন জায়গায় নীলের একটু আভাসমাত্র থাকলেও সেটি তার দৃষ্টি এড়াতো না। বাগানে ঘাসের মধ্যেও খুব ছোট নীল রঙের একতা জংলী ফুল ফুটে থাকলেও ঠিক ওঁর চোখে পড়তো। বলতেন, ‘দ্যাখো দ্যাখো, কী চমৎকার ফুলটা’। অথচ আমরা হয়তো লক্ষ করেও ফুলটি খুঁজে বের করতে মুশকিলে পড়তাম। হাসতেন আর বলতেন, ‘কী আশ্চর্য, এত স্পষ্ট জিনিসটা দেখতে পাচ্ছো না? অথচ আমি তোমার লাল ফুল ভাল দেখতে পাইনে বলে আমাকে ঠাট্টা করো। নীল রঙটা যে পৃথিবীর রঙ, আকাশের শান্তির রঙ, তাই ওটার মধ্যে আমার চোখ ডুবে যায়; আর লাল রঙটা হল রক্তের রঙ, আগুনে রঙ অতএব প্রলয়ের রঙ, মৃত্যুর রঙ – কাজেই বেশী না দেখতে পেলে দোষ কি?’

কেবল নির্মলকুমারীই নয়, বিচ্ছিন্নভাবে রোমা রঁল্যা, স্টেলা ক্রামরিশ, জগদীশচন্দ্র বসু, রাণী চন্দ সহ অনেকের কাছেই রবীন্দ্রনাথের এই বর্ণান্ধতার ব্যাপারটা ধরা পড়েছিল।

রাণী চন্দ তাঁর ‘আলাপচারী রবীন্দ্রনাথ’-এর ভূমিকায় বলেছেন,

‘গুরুদেব প্রায়ই বলতেন তিনি রঙকানা, বিশেষ করে লাল রঙটা নাকি তার চোখেই পড়ে না। অথচ দেখেছি অতি হাল্কা নীল রঙও তার চোখ এড়ায় না। একবার বিদেশে কোথায় যেন ট্রেনে যেতে যেতে তিনি দেখছেন অজস্র ছোট ছোট নীল ফুলে রেললাইনের দুদিক ছেয়ে আছে। তিনি বলতেন, ‘আমি যত বউমাদের ডেকে ডেকে সে ফুল দেখাচ্ছি- তাঁরা যেন দেখতেই পাচ্ছিলেন না। আমি অবাক হয়ে যাচ্ছিলুম, এমন রঙও লোকের দৃষ্টি এড়ায়’।

কেবল তৃতীয়পক্ষের জবানবন্দিতে নয়, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও বোধহয় এই বিষয়টি জানতেন। এমন একটি চিঠির কথা শুরুতেই বলেছি, আরও একটি চিঠির সাক্ষ্য দেওয়া যাক।

এই চিঠিটি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ১৯৩১ সালে। ড. সরসীলাল সরকারকে।

রবীন্দ্রনাথ সেখানে লিখেছিলেন,

‘চৈতন্যের নানা দিক আছে, এক আলো থেকেই নানা রঙের বোধ, এও তেমনি। কেউ লাল রঙ দেখতে পায় না, কেউ নীল, কেউ বা এটা বেশী দেখে, কেউবা ওটা। আমি আজকাল ছবি আঁকি, সেই ছবিতে বর্ণসংযোজনের বিশেষত্ব আছে। এই বিশেষত্বের কারণ আমার চৈতন্যে রঙের বিশেষ ধারণার মধ্যে। আমি সব রঙকে সমান দেখিনে, পক্ষপাত আছে, কেন আছে কে বলবে?’

ওপরের প্লে বাটনে ক্লিক করে শুনুন পুরো পডকাস্টটি…

লেখা: সানু ঘোষ
পাঠ: শঙ্খ বিশ্বাস
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল