অভিশপ্ত তেরোই এপ্রিল, জালিয়ানওয়ালাবাগ-এর নারকীয় গণহত্যার অভিশপ্ত মুহূর্ত, ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন!

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 13, 2021 10:05 pm|    Updated: May 8, 2021 11:12 am

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 13, 2021 10:05 pm Updated: May 8, 2021 11:12 am

তখনও পর্যন্ত পঞ্জাবে রাওলাট সত্যাগ্রহকে ঘিরে তেমন কোনও হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেনি। ৯ তারিখ গান্ধীজির পঞ্জাব প্রবেশ আটকে দেওয়া হল। তার পরদিনই সইফুদ্দিন কিচলু আর সত্যপালকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হল কোনও ‘অজানা’ গন্তব্যে। নেতাদের গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষুব্ধ অমৃতসরবাসী ১০ এপ্রিল পথে নামলেন। আগুন জ্বলল কিছুক্ষণের মধ্যেই। নেতাদের মুক্তির দাবিতে প্রচুর মানুষ হাঁটছিলেন শহরের ডেপুটি কমিশনারের বাড়ির অভিমুখে। মিলিটারি পিকেট তাঁদের পথ আটকানোর পর ব্যারিকেড ভেঙে কিছু মানুষ এগোনোর চেষ্টা করলে শুরু হয়ে যায় গণ্ডগোল। অচিরেই ভিড় লক্ষ্য করে গুলি চালায় সেনা, কুড়ি-পঁচিশ জনের মৃত্যু ঘটে! এরপর জনতার একাংশও হয়ে ওঠে উন্মত্ত। তারা আক্রমণ করে টাউন হল, দুটো বিদেশি ব্যাঙ্ক, টেলিগ্রাফ আর টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসে। মারমুখী জনতার হাতে পাঁচ জন সাহেবের প্রাণ যায়। দু’জন মেমসাহেব আক্রান্ত হয়ে কোনও রকমে পালিয়ে বাঁচেন। সঙ্গে সঙ্গে গোটা শহরে জারি হয় মিলিটারি শাসন। অমৃতসরে ১৩০ জন ইংরেজ নর-নারী’কে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ‘নেটিভ’দের উচিত শিক্ষা দেওয়ার বন্দোবস্ত শুরু হতে বেশি দেরি হল না।

পরদিন অর্থাৎ ১১ এপ্রিল, সকাল থেকে আকাশে বোমারু বিমান, রাস্তায় কারফিউ আর সেনা টহল। রাতেই শহরে পা রাখলেন জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যার খল-নায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার। গভীর রাতে বিদ্যুৎহীন করে দিলেন গোটা শহরকে। পর দিন সকাল থেকেই শহরবাসীর মাথার ওপর চক্কর দিতে লাগল রয়্যাল এয়ারফোর্সের যুদ্ধবিমান। ১২ তারিখ থেকে শহরের দখল নিল জেনারেল ডায়ার-এর সেনা। নিজে তিনি বেরোলেন দুটো সাঁজোয়া গাড়ি নিয়ে। গোটা অমৃতসর শহরে তখন বিদ্যুৎ, জল কিচ্ছু নেই। বিশেষ ছাড়পত্র ছাড়া কারও পক্ষে শহরে ঢোকা বা বেরনো কার্যত অসম্ভব। ১২ তারিখে শহরের কিছু জায়গায় তিনি নোটিস ঝুলিয়ে মিটিং-জমায়েত নিষিদ্ধ করে দিলেন। কিন্তু শহরের কিছু মান্যগণ্য মানুষ ঠিক করলেন, পর দিন, ১৩ তারিখ বিকেলে একটা শান্তিপূর্ণ মিটিং করে কিচলু ও সত্যপাল-এর মুক্তির দাবি তোলা হবে, সেই সঙ্গে ১০ তারিখের অনভিপ্রেত ঘটনার পর সাধারণ মানুষের চরম হয়রানি ও যথেচ্ছ গ্রেফতারের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানানো হবে। সেইমতো বিকেল চারটে থেকেই জমায়েত শুরু হয় স্বর্ণমন্দিরের কাছাকাছি বাগান-চত্বরে। ওখানে নিয়মিত মিটিং হত। সে দিন কিন্তু কোনও নোটিস ঝোলানো ছিল না ওই চত্বরে, ঢোকার মুখে ভিড় আটকানোর চেষ্টাও হয়নি, যদিও চারদিকে ছিল প্রখর নজরদারি।

মিটিং শুরু হওয়ার পর ডায়ার তাঁর প্ল্যানমাফিক ওই চত্বরের একমাত্র সরু প্রবেশ-প্রস্থান পথের মুখে দুটো সাঁজোয়া গাড়ি লাগালেন। বেয়াদব লোকগুলো যাতে দৌড়ে বেরিয়ে পালাতে না পারে, সে জন্যে রাস্তার দু’ধারে মিলিটারি পিকেট বসানো হল। আকাশপথে পরিদর্শনও সম্পূর্ণ! হাঁটু-গেড়ে বসা বালুচ আর গোর্খা সৈন্যরাও প্রস্তুত, আর তার পরেই এলো পৃথিবীর নৃশংতম গণহত্যার হুঙ্কার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার হুকুম দিলেন ‘ফা—য়া—র’… শুরু হল তীব্র গুলিবর্ষণ! ভিতরে তখন প্রায় হাজার খানেক লোকের জমায়েত। এর মধ্যে কয়েকশো লোককে খতম না করতে পারলে কীভাবে প্রতিশোধ নেওয়া যাবে! কীভাবে ভেঙে দেওয়া যাবে যত বিদ্রোহ-সত্যাগ্রহ-বিপ্লবী চক্রান্ত! অতঃপর গুলি চলল, রাউন্ডের পর রাউন্ড… জালিয়ানওয়ালা’র বাগে সেদিন মুহূর্তেই নিভে গেল কয়েক শো মানুষের জীবন-দীপ, গুলিতে তো বটেই আরও বহু মানুষের মৃত্যু হল আত্মরক্ষার তাড়নায় কুয়োতে ঝাঁপ দেওয়ার ফলে। সেই কুয়োর উপরেই পরবর্তীতে নির্মিত হয়েছে শহিদ স্মারক, ‘শহিদি কুঁয়া’, যার অতলে এখনও মিশে আছে বহু বহু মানুষের আর্তনাদ, মিশে আছে সেদিনের ভয়ানক, ভয়ানক বীভৎসতার বিরুদ্ধে সন্ত্রস্ত চিৎকার।

শুনুন…

লেখা: সানু ঘোষ
পাঠ: অনুরণ সেনগুপ্ত
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল