রজনী–গোলাপ স্তবক পেয়ে আফশোস করে বলতেন, ‘এঁরা বক বা কুমড়োফুল দেন না কেন? ভেজে খেতাম!’

Published by: Sankha Biswas |    Posted: January 20, 2021 10:27 am|    Updated: January 25, 2021 8:08 pm

Published by: Sankha Biswas Posted: January 20, 2021 10:27 am Updated: January 25, 2021 8:08 pm

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর দেবশঙ্কর হালদার। দুই দিকপাল নাট্যব্যক্তিত্বের আড্ডা হত মাঝে মাঝেই। এমনি এমনিই। নানান বিষয়ে কথা হত। করোনা পর্বে ঠিক হয়েছিল ২০ দিন অন্তর আড্ডা দেবেন প্রিয় ‘দেবু’র সঙ্গে। বিনাবাক্যে সম্মত হন দেবশঙ্করও। ৪ অক্টোবর ছিল আড্ডায় বসার নির্ধারিত দিন, যার ঠিক একদিন আগে অসুস্থ হন সৌমিত্র। আড্ডায় আর বসা হয়নি তাঁদের।

সেরা শিক্ষকের সঙ্গে কাটানো স্মৃতি রোমন্থন করলেন দেবশঙ্কর হালদার, ভাগ করে নিলেন টিম ‘শোনো’র সঙ্গে। শুনলেন, শ্যামশ্রী সাহা ও সুশোভন প্রামাণিক।

সৌমিত্রদা খুব বেঁচে থাকাটাকে প্রাধান্য দিতেন। বেঁচে থাকা মানে সর্বার্থে বেঁচে থাকা। সব কিছু নিয়ে বেঁচে থাকা। সমস্ত কিছুর মধ্যে বেঁচে থাকা। সেটা উনি নিজের একটা পাঁচ লাইনের কবিতায় ব্যক্ত করেছেন। কবিতাটার নাম: ‘সুবিবেচনা’। আমি একটা পত্রিকায় পড়েছিলাম। কবিতাটা এরকম:

‘কখনও কখনও বাঁচাটাই খুব সূক্ষ্ম বিবেচনার কাজ বলে মন হয়

কারণ, এখন দেশে রয়ে গেছে বাঁশি হাতে মহিষের সুরেলা রাখাল

দুপুর বিবশ করার কাজ শুরু করে দিলে, হে রাখাল?

বেঁচে থাকাটাই বড় সুবিবেচনার বলে মনে হয়।’

এটা যিনি বলেন, তাঁর জন্মদিন পালন করতে গেলে আমরা যে বেঁচে আছি, সদর্থক আছি, এইটার একটা নিদর্শন রাখতে হয়।

সৌমিত্রদাকে দেখেছি, অভিনয় করছেন, অভিনয়ের সঙ্গে থাকছেন, এবং একই সঙ্গে অভিনয়কে পুষ্ট করার জন্য, অভিনয়ের গাছের গোড়ায় জল দেওয়ার জন্য কবিতা লিখছেন, গান গাইছেন, ছবি আঁকছেন, আড্ডা দিচ্ছেন। এবং সর্বোপরি, ভাবছেন। সময় নিয়ে সবসময় ভেবে চলেছেন। এইটা একটা দারুণ ব্যাপার! আমার সবসময় মনে হয়েছে ওঁর পাশে অভিনয় করার সময় যে, চলচ্চিত্রেই হোক বা মঞ্চেই হোক পাশে এমন একজন মানুষ অভিনয় করছেন, যিনি শুধু অভিনয় করছেন না, তার মধ্যে আমাকে এবং চারপাশটাকে জরিপ করছেন। এবং, ভাবছেন, যে পরবর্তী পদক্ষেপটা আমার বা ওঁর কী হবে।

আমাদের নাটকের শেষে ‘কার্টন কল’ হয়। উদ্যোক্তারা পুষ্পস্তবক, উত্তরীয় এগুলো দিয়ে তাঁদের মতো করে সম্মান জানাতেন। কেউ কেউ এইসব মেডেল-টেডেল বা স্মারক ইত্যাদি। কেউ কেউ ওঁর ছবি এঁকে দিতেন ফ্রেমে বাঁধিয়ে সুন্দর করে। তো যখন ওঁকে ফুলটা দেওয়া হত, মানে ফুলটা যখন এগিয়ে আসছে, উনি আমার কানের কাছে মুখ এনে বলতেন, ‘আচ্ছা, এই রজনীগন্ধা–গোলাপ এই ফুলগুলো যে দেবে; তুমি ভাবো, তার বদলে যদি একটু বকফুল, কুমড়োফুল দিত, বাড়ি নিয়ে গিয়ে ভেজে খেতে পারতাম! এরা কেন বকফুল দেয় না বলো তো?’

যেদিন ওঁকে দাহ করা হয়, আমি ছিলাম। মনে হল যেন উনি শট দিচ্ছেন। যেমন করে কস্টিউমের লোকেরা, সেটের লোকেরা, পরিচালকের নির্দেশ অনুযায়ী সাজিয়ে দেন… শ্মশানে আমরা কত শট দিয়েছি। মনে হল যেন বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করবেন, ‘সব ঠিক আছে তো?’

শুনুন…

লেখা: শ্যামশ্রী সাহা, সুশোভন প্রামাণিক
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল