শৈশবে সংগীত মানেই ছিল মাতাল বাবার অত্যাচার, খ্যাতির মধ্যগগনে সম্পূর্ণ বধির হয়েও বিঠোফেন তৈরি করেছিলেন ‘নাইন্থ সিম্ফনি’

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 1, 2021 11:00 pm|    Updated: April 2, 2021 3:33 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 1, 2021 11:00 pm Updated: April 2, 2021 3:33 pm

বছর চারকের একটি অভুক্ত শিশু কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে কখন, এমন সময় তাঁর মদের নেশায় চুর বাবা ফিরলেন বাড়ি। অতঃপর গভীর রাতে অতটুকু শিশুকে জোর করে বিছানা থেকে তুলে এনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বেহালা আর ক্লাভিয়ার সাধতে বাধ্য করা হল। শিল্পী মোৎসার্ট ছোটোবেলা থেকেই যা পারতেন সে কেন তা পারবে না? এই ভাবনা থেকেই দিনের পর দিন একটি অসহায় শিশুর উপর সঙ্গীত শিক্ষার নামে নির্যাতন চালিয়ে যেতে লাগলেন তাঁর বাবা। ছোট্ট সেই শিশুটিই ভবিষ্যতের বিঠোফেন— শৈশবে সঙ্গীত যার জীবনে এসেছিল মধ্যরাতের নির্যাতন হয়ে।

বিঠোফেনের বাবা ছিলেন অতি দরিদ্র এক গায়ক। সুরের প্রতি যত না আসক্ত; সুরার প্রতি তার চেয়ে বেশি। সংসারের অভাব তাই লেগেই থাকত, মিটত না। ছেলে বিঠোফেনকে তিনি মোৎসার্টের মতো গড়ে তুলবেন—এই ছিল তাঁর ইচ্ছে। মাতাল আর অত্যাচারী হলেও হয়তো বিঠোফেনের ভেতর লুকোনো প্রতিভাকে তিনি চিনেছিলেন। কিন্তু অভাব বড়ো দায় হয়ে দাঁড়াল! মাত্র ৯ বছর বয়সে বিঠোফেনকে হতে হল ‘বন’ শহরের কোর্ট অর্গানিস্টের শিষ্য। বছর যেতে না যেতেই অবশ্য জাত চেনাতে লাগলো সেই ছোট্ট ছেলেটি। ১১ বছর বয়সে নিজেই হয়ে উঠলেন কোর্ট অর্গানিস্ট।

উনিশ বছর বয়সে হারালেন মাকে। পরিবারের সব দায়ভারই এবার এসে চাপল তাঁর উপরেই। সব সামলেও বিঠোফেন চালিয়ে গেলেন তাঁর সঙ্গীত সাধনা, সঙ্গীত শিক্ষা। ভিয়েনায় গেলেন তিনি, বিখ্যাত সুরকার হাইডেনের কাছে শিখলেন অনেক কিছু। ঘুরে ঘুরে সঙ্গীত শিক্ষা করতে করতেই ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে একদিন তাঁর দেখা হয়ে গেল কিংবদন্তি সুরকার মোৎসার্ট-এর সঙ্গে, আশৈশব তাঁকে তাঁর বাবা যার মতো গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সেই মানুষটি। নিজের অজান্তে শ্রদ্ধায় বা জেদে সেই ভোলফ্‌গাঙ্গ আমাডিউস মোৎসার্ট—যার মতো হওয়ার সাধনাতেই পা বাড়িয়েছেন তিনি নিজেও। মোৎসার্ট তখন সুবিখ্যাত, কিন্তু বিঠোফেন নামের ছেলেটির প্রতিভার পরিচয় পেয়ে তিনি বলেছিলেন— take note of him! One day he will be famous. একজন গুণীই চিনতে পারেন আরেক গুণীকে—এ কথা তারই প্রমাণ।

বিঠোফেনের প্রতিভা বিকশিত হয়েছিল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। লোকে বলত বিঠোফেন যখন আপন মনে পিয়ানো বাজাতেন, সুরে নিমজ্জিত হতেন, তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত এক অপার্থিব সুরের ধারা! অল্প সময়েই ছড়িয়ে পড়ল তাঁর খ্যাতি। ইউরোপের সংগীতমহলে ফ্যান বিঠোফেন হয়ে উঠলেন এক নতুন আইকন।
এই দিনগুলিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন হতে পারত, কিন্তু বিধাতা বোধহয় অলক্ষে অন্য কিছু পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁর জন্য। এইসময় থেকেই এক জটিল স্নায়ুরোগের শিকার হলেন বিঠোফেন, ধীরে ধীরে অসাড় হতে লাগল তাঁর শ্রবণশক্তি। ভাবুন, একজন সুরকার— সুরের শ্রুতি মাধুর্যেই যার শিল্পের প্রকাশ— ক্রমশ তিনিই হারিয়ে ফেলছেন শোনার ক্ষমতা, বিঠোফেন একবার এ প্রসঙ্গে আক্ষেপ ভরা স্বরে বলেছিলেন, ‘যদি আমি অন্য কিছু করতাম তাহলে এই শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলা হয়তো আমাকে এতোটা কষ্ট দিত না, কিন্তু যে আমি সুরের সৃষ্টিতেই মেতে থাকতাম, সেই আমিই এখন না শুনতে পাই একটা পাখির ডাক, না শুনতে পাই মানুষের কথা।
এই ভয়ানক ট্র্যাজেডির নামই বিঠোফেন— একজন শিল্পীর জীবনে এর চেয়ে হতাশার আর এর চেয়ে নির্মম আর কীই বা হতে পারে! বিঠোফেন ক্রমশ বধির হয়ে যেতে লাগলেন, এই যন্ত্রণা তাঁর মনকে তীব্র বিষাদে ডুবে যেতে থাকেন ক্রমশ, ক্রমশ তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিলেন, একাকীত্ব আর হীনমন্যতায় দ্বৈত শরিকানায় তিনি হয়ে উঠলেন খিটখিটে আর বদ-মেজাজি। কাউকে কাছে ঘেঁসতে দিতেন না, মেজাজ দেখাতেন। কিন্তু কেন তিনি এমন করছেন, কেন একজন শিল্পী—জীবন আর প্রকৃতি নিয়েই যার পথ চলার কথা, কেন সে তলিয়ে যাচ্ছে একাকীত্বের অন্ধকারে, কেউ তা বোঝেনি সেদিন। আপনজনরাও ভুল বুঝে দূরে সরে গেছে তাঁর থেকে।

এই অবসাদ যাপনের কথা বলতে গিয়ে বিঠোফেন তাঁর ডায়ারিতে লিখেছিলেন:
‘তোমরা যারা আমাকে বদমেজাজি, একগুঁয়ে এবং মানববিদ্বেষী বলে মনে কর, তারা আমার প্রতি ভয়ানক অবিচার করেছ। কেন যে আমাকে এমন মনে হয়, সে-কথা তোমরা জান না।… একবার ভেবে দ্যাখো যে গত ছ-বছর ধরে অযোগ্য চিকিৎসকদের হাতে পড়ে কী দশা হয়েছে আমার! বছরের পর বছর সারিয়ে তুলবার আশা দিয়ে হঠাৎ একদিন তাঁরা আমায় জানাল, এ ব্যাধি আর সারবে না। যে আমি হাসিখুশি স্বভাব এবং মজলিসি মেজাজ নিয়ে জন্মেছিলাম তাকে কিনা আজ বাধ্য হয়ে সমাজের আর পাঁচ জনের থেকে সরে থাকতে হচ্ছে। নিজের অসুস্থতার কথা ভুলে গিয়ে যখনই স্বাভাবিকভাবে লোকজনের সঙ্গে মিশতে যাই তখনই পাই প্রচণ্ড আঘাত। তার জ্বালা বোধহয় একাকীত্বের চেয়েও নিদারুণ। সকলকে ডেকে তো বলতে পারি না, ‘জোরে কথা বলুন— চিৎকার করে বলুন, আমি কানে শুনতে পাই না।’ … অথচ একদিন এই দুটি কানের সাহায্যেই সব সুরকারকে অতিক্রম করে এমন উচ্চ আসনে আমি নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছিলাম যা করতে ভবিষ্যতে কেউ পারবে বলে মনে হয় না।’

শুনুন…

লেখা: সানু ঘোষ
পাঠ: সুশোভন প্রামাণিক
আবহ: শুভাশিস চক্রবর্তী

পোল