সোনাগাছি ও সেকেলে কলকাতার বারাঙ্গনা সংবাদ

Published by: Sohini Sen |    Posted: October 13, 2020 8:48 pm|    Updated: November 25, 2020 4:31 pm

Published by: Sohini Sen Posted: October 13, 2020 8:48 pm Updated: November 25, 2020 4:31 pm

সেকালে মহানগরীতে পতিতাপল্লির প্রধান ঠেক হয়ে উঠেছিল লালদিঘি থেকে বউবাজারের মধ্যবর্তী রাস্তার দু’ধার। ভিনদেশি নাবিক আর মাঝি-মাল্লা অথবা শ্রমিকদের জন্য গণিকালয় গড়ে উঠেছিল খিদিরপুর, দর্মাহাটা, আহিরীটোলা ইত্যাদি স্থানে। ইংরেজ সৈন্যদের জন্য জানবাজার ও বউবাজারে গড়ে ওঠে গণিকালয়।

সোনাগাছির সঙ্গে প্রায় সমার্থককরূপে ‘রূপোগাছি’ নামকরণ হয়েছিল গরানহাটা এলাকার। সংখ্যায় ও বৈচিত্রে সোনাগাছি যদি পয়লা নম্বর হয়, গরানহাটা তবে দ্বিতীয়, তাই রূপোগাছির কদরও কম ছিল না।

হাড়কাটা, বৌবাজার, সোনাগাছি, রূপোগাছি, রামবাগান, চিৎপুর ছাড়াও কিছু উৎকৃষ্ট বারবনিতারা থাকতেন কড়েয়াতে। এঁরা মূলত ইউরোপীয় আর অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। এছাড়াও শহরে ফরাসি, রাশিয়ান, চিনে, ইহুদি এমন নানা বিদেশি পতিতারা থাকতেন। খিদিরপুর জাহাজঘাটার কাছেই ওয়াটগঞ্জে ছিল জাপানি পতিতাদের বাস।

সমাজে বেশ্যারা ছিলেন অচ্ছুৎ, কিন্তু তাঁদের নিজেদের মধ্যে জাতবৈষম্য ছিল যথেষ্ট প্রকট। উঁচু জাতের বারবনিতা নীচু জাতের বারবনিতার হাতে জল স্পর্শ করতেন না। মুসলমান বা নিম্নবর্ণ হিন্দু খদ্দেরের আনাগোনা যাঁদের কাছে, তাঁদের সাথেও জলচল ছিল না। অনেক সময়ই এদেশীয় খ্রিস্টান এবং মুসলমানরা নিজের নামের শেষে ‘দেবী’ লিখতেন, যাতে মনে হয় তাঁরা হিন্দু আর হিন্দু মেয়েদের খদ্দের পাওয়ার সম্ভবনাই বেশি। তাই পরিচয় গোপনের এই খেলা চলত। আসলে শরীরের কোনও জাত নেই, কামনার কোনও ধর্মও নেই, বেশ্যাসক্তি অপরাধ নয়, কিন্তু বিধর্মী মাগির শরীর ভোগ করলেই জাত যাবে––– এমন ধারণা সেকালের কোনও কোনও বাবুদের ছিল। অবশ্য সেকালের বাইজিরা ছিলেন সব মুসলমান। এরা এসব নামটাম বদলের ধারও ধারত না।

সেকালে নারী আসলে ছিল যৌন উপকরণ মাত্র। বালবধূ, বাল্যবিধবা, বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাওয়া অবিবাহিত মেয়েদের, যৌন আকাঙ্খা অবদমিত করে রাখতে হত, অথবা পরিবারের মধ্যেই নানাভাবে তাঁদের ব্যবহার করা হত। ফলস্বরূপ অনেকেই স্বেচ্ছায়, অনেকেই পরিস্থিতির চাপে পড়ে, বেশ্যাপাড়ায় আশ্রয় নিতেন। তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় গণিকাদের সংখ্যা ছিল ১২,৪১৯, মাত্র এক দশকে সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ১৮৬৭-এর সরকারি রিপোর্টে জানা যায়, কলকাতার গণিকাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে, প্রায় ৩০০০০-এ।

তখনও ‘রবীন্দ্রসংগীত’ নামকরণ হয়নি, বলা হত ‘রবিবাবুর গান’। অবিশ্বাস্য হলেও ‘বেশ্যাসংগীত’ হিসেবে বেশ জনপ্রিয় উঠেছিল রবি ঠাকুরের গান। নিষিদ্ধপল্লির কোনও কোনও ঘর থেকে সেসময় ভেসে আসত ‘কেনো যামিনী না যেতে জাগালে না…’।

 

লেখা: সুশোভন প্রামাণিক
পাঠ: কোরক সামন্ত
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল