এই শহরের পথে-ঘাটে মিশে আছে দেশীয় রাজা আর জমিদার’দের স্মৃতি, তাঁদের নামে রয়েছে একাধিক রাস্তাও, তেমন কয়েকটির ইতিহাস-ভূগোল

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 15, 2021 5:34 pm|    Updated: May 8, 2021 11:12 am

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 15, 2021 5:34 pm Updated: May 8, 2021 11:12 am

উত্তর কলকাতায় শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে গেলেই পড়বে ‘মোহনবাগান’ অঞ্চল। এই নাম শুনে মোহনবাগান ফুটবল ক্লাবের কথা মনে আসাই স্বাভাবিক, আর সঠিকও। কিন্তু যদি মনে করেন শতাব্দী প্রাচীন গৌরবোজ্জ্বল সেই ফুটবল ক্লাবের নামেই এলাকাটির নাম হয়েছে তাহলে কিন্তু ভুল করবেন। আসলে হয়েছিল উল্টো ব্যাপার।

এই অঞ্চলে এককালে ছিল বিশাল একটি বাগান, যার মালিকানা ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির রাজা নবকৃষ্ণ দেবের পোষ্যপুত্র রাজা গোপীমোহন দেব-এর। গোপীমোহনের নাম অনুসরণেই তার সেই বাগানকে লোকে বলত ‘মোহনবাগান’, সেকালে এর ঠিকানা ছিল ১ নম্বর ফড়িয়াপুকুর স্ট্রিট। গোপীমোহনের পর ‘মোহনবাগান’-এর মালিক হন তাঁর একমাত্র ছেলে রাজা রাধাকান্ত দেব। কিন্তু রাধাকান্তের উত্তরপুরুষরা এই বিশাল মোহনবাগান নিজেদের হেফাজতে রাখতে পারলেন না, উনিশ শতকের আটের দশকে এই বিশাল জমি কিনে নিলেন কীর্তিচন্দ্র মিত্র। পাটের ব্যবসায়ে তাঁর লক্ষ্মীলাভ অনেকেরই ঈর্ষার কারণ হয়েছিল। কীর্তি মশায়েরই মহান কীর্তি হল ‘মোহনবাগান ভিলা’, সেই বিশাল বাগানের মাঝখানে এক মর্মর প্রাসাদ নির্মাণ করিয়ে তিনি সকলকে তাক লাগিয়ে দেন। চারপাশের সবুজের মাঝে অমন দুধসাদা ভিলা সেকালের ফড়িয়াপুকুর অঞ্চলের এক বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল। যদিও কীর্তিচন্দ্র মশায় বেশিদিন এই বাড়ি ভোগ করতে পারেননি। অতঃপর তাঁর ছেলে প্রিয়নাথ মিত্র ভিলা আর বাগানের মালিক হন। এসবের বিলুপ্তিও তাঁরই হাতে, কিন্তু মোহনবাগান’কে তিনি অক্ষয় করে রেখে গেছেন কলকাতার রাজপথ থেকে ফুটবলের ময়দানে। পাটের ব্যবসায়ে বাবার মতোই লক্ষ্মীলাভ ঘটেছিল প্রিয়নাথেরও, কিন্তু কেবল ব্যক্তি সুখে সেই অর্থ ব্যয় না-করে পি মিত্র, মানে প্রিয়নাথ মিত্র অনেক সামাজিক কাজকর্মও করতেন।

১৮৮৫ সাল নাগাদ তাঁর মোহনবাগান ভিলার দক্ষিণ ধার দিয়ে আপার সার্কুলার রোড অর্থাৎ এখনের আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড পর্যন্ত একটি আড়াআড়ি রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেয় কলকাতা পুরসভা। রাস্তার জন্য মোহনবাগানের বেশ খানিকটা জমি ছেড়ে দেন প্রিয়নাথ। পুরসভাও এই দানের মর্যাদা দিতে, সেই রাস্তাটির নামকরণ করে মোহনবাগান লেন। এখনও এই রাস্তা বহাল তবিয়তে আছে। মোহনভিলার পাশ দিয়ে যাওয়া এই মোহনবাগান লেন ধরেই সেকালে ফুটবল নিয়ে প্র্যাকটিস করতে প্রিয়নাথ মিত্রের বাড়ির কম্পাউন্ডে আসতেন নতুন তৈরি হওয়া ক্লাবের ছেলেরা। ১৮৮৯-এর সেই ক্লাবের নাম সেকারণেই হয়ে গেল ‘মোহনবাগান’। প্রিয়নাথ মিত্র শুধু যে ক্লাবের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তাই নয়, ক্লাবের প্র্যাকটিসের জন্যে নিজের সাধের বাগানটিও তিনি দিয়েছিলেন হাসি মুখে।

গাছ-গাছলি ভরা মোহনবাগান, মোহনভিলা কিছুই আজ আর নেই বটে, কিন্তু মোহনবাগান নামে এই এলাকায় রয়েছে আরও একটি রাস্তা, সেটির নাম মোহনবাগান রো। ১৮৯০ সাল নাগাদ প্রিয়নাথ এই বিশাল বাগান আর বাড়ি বিক্রি করে দেন। ১৩ বিঘা জমির এই বিরাট প্লটকে এরপর পুরসভা টুকরো টুকরো করে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলেই জমির মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে আসে ১৮ কাঠার মতো জায়গার একটি পথ। পুরসভা নিজের খরচে রাস্তাটি বাঁধিয়ে দেয়, নাম দেয় মোহনবাগান রো। সেই রাস্তার দুপাশে এখন অজস্র নতুন বাড়ি। ১৩ বিঘা জমির সেই মোহনবাগান, যেখানে প্রথম প্র্যাকটিস করত মোহনবাগান ক্লাবের ফুটবলাররা আজ তা এক ঘনবসতিপূর্ণ পাড়া, যার একপাশে মোহনবাগান লেন, আরেক পাশে মোহনবাগান রো। কলকাতার একটুকরো অঞ্চলের সঙ্গে এভাবেই যুক্ত হয়ে গিয়েছে একটি ফুটবল ক্লাবের ইতিহাস।

শুনুন…

লেখা: সানু ঘোষ
পাঠ: কোরক সামন্ত
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল