কলিকেতার বাইক কাহিনি

Published by: Susovan Pramanik |    Posted: April 9, 2021 10:47 pm|    Updated: April 9, 2021 10:58 pm

Published by: Susovan Pramanik Posted: April 9, 2021 10:47 pm Updated: April 9, 2021 10:58 pm

বহুদিন আগের কথা। তখন কলকাতা শহরটাও ছিল অনেক অন্যরকম। এক সেলিব্রিটি তখন মোটরবাইক চালাতেন। তিনি আর কেউ নন, সেইসময়ের জনপ্রিয়তম নায়ক এবং গায়ক—কুন্দনলাল সায়গল। নিউ থিয়েটার্স থেকে কাজ সেরে একদিন সায়গল বাড়ি ফেরার জন্য তৈরি হচ্ছেন, এমন সময় উনি দেখলেন, পঙ্কজ কুমার মল্লিক হেঁটে আসছেন। সেদিন পঙ্কজবাবুর সাথে গাড়ি ছিল না। সায়গল বললেন—উনি সেদিন নিজের নতুন বাইকে চাপিয়ে পঙ্কজ মল্লিক’কে লিফট দেবেন। পঙ্কজ বাবু’কে ওঁর বাড়িতে নামিয়ে তারপর উনি যতীন দাস রোডে নিজের বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু পঙ্কজ মল্লিক এই প্রস্তাবে কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। প্রথমত, তাঁর বাইকের পিছনে বসতে একটু ভয় করে। দ্বিতীয়ত, উনি সায়গল সাহেবের বাইকে বসে যেতে একদমই রাজি নন তার অন্য একটি কারণ আছে। আসল কথাটি হলো—সায়গল প্রায়শঃই পান করে বাইক চালাতেন এবং সেটি সবাই জানত। পঙ্কজবাবু কোন ঝুঁকি নিতে রাজি ছিলেন না। উনি যদিও সরাসরি সেই কথাটা বলছিলেন না। নিজের ফোবিয়ার কথাটাই তুলে ধরছিলেন বারবার। এইবার সায়গল বললেন: ‘গিয়ে দেখে এস, পঞ্জাবে মেয়েরা নিজেরা বাইক চালাচ্ছে, আর তুমি একজন পুরুষ-মানুষ হয়ে সামান্য বাইকে চাপতে ভয় পাচ্ছ! ছি ছি ছিঃ।’

এই কথা শুনে, কিছুটা নিজেকে পুরুষ-সিংহ প্রমাণ করতেই বাধ্য হয়ে পঙ্কজ মল্লিক সায়গলের বাইকের পেছনে চেপে বসলেন। সায়গল তৎক্ষণাৎ একদম নায়কোচিত ভঙ্গিমায় বাইক স্টার্ট করলেন।

গোলমালটা হলো কিছুক্ষনের মধ্যেই। চন্ডী ঘোষ রোডে, নানুবাবুর বাজারের ঠিক সামনে, পঙ্কজবাবু বাইক থেকে পড়ে গেলেন। সায়গলের অবশ্য সেদিকে কোনই হুঁশ রইলনা। উনি ঝড়ের বেগে বাইক চালিয়ে নিজের বাড়ি পৌঁছে গেলেন। বাড়ি গিয়ে, বাইক রেখে নিজে ফ্রেশ হয়ে বসার কিছুক্ষন পর হঠাৎ সায়গলের মনে হলো যে উনি তো স্টুডিও থেকে ফেরার সময়, নিজের বাইকে পঙ্কজবাবুকে তুলেছিলেন। তাহলে কি হলো? পঙ্কজ মল্লিক গেলেন কোথায়? ব্যাপারটা ওঁর মাথাতেই ঢুকলো না। আর যে সময়ের কথা বলছি, তখন মোবাইল তো কল্পনার বাইরে, ল্যান্ড ফোনেরই এত প্রচলন ছিল না। অগত্যা সেই রাতে আর কোন খবর সায়গল নিতে পারলেন না।

পরদিন, ‘নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও’তে পঙ্কজ কুমার মল্লিক’কে দেখামাত্র পাকড়াও করলেন সায়গল।

‘কি ব্যাপার পঙ্কজ? কাল তুমি কোথায় নামলে বলো তো? আমি তো কিছু টের পেলাম না।’ সায়গলের প্রশ্নে পঙ্কজবাবু মাথা নীচু করে উত্তর দিলেন: ‘না, মানে আমি তো কোথাও নামিনি।’ এই উত্তর শুনে, সায়গল আরও অবাক। তখন ব্যাপারটা খুলে বললেন পঙ্কজবাবু: ‘আসলে ওটাকে তো ঠিক নামা বলে না। নানুবাবুর বাজারের সামনে আমি বাইক থেকে পড়ে গেছিলাম, কিন্তু আপনি না থেমে সোজা বেরিয়ে গেলেন। এই দেখুন, আমার গায়ে হাতে বেশ কিছু জায়গা কেটে ছড়ে গেছে। হাত পা ভাঙেনি ভাগ্য ভালো।’

ঘটনা শুনে, সায়গল সাহেব প্রাণখোলা হাসি দিয়ে গেয়ে উঠলেন: ‘প্রেমের পূজায় এই তো লভিনু ফল।’

ধীরে ধীরে এই কাহিনি সকলের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো। এর বেশ অনেক বছর পরের ঘটনা। অফিস টাইমে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ’তে দাঁড়িয়ে আছেন এক সুবিখ্যাত গীতিকার। যেতে হবে গড়িয়াহাট। রয়েছে খুব তাড়া, অথচ সেদিন সঙ্গে গাড়ি নেই। ট্যাক্সিও পাওয়া যাচ্ছে না। এমন সময় ঝড়ের বেগে মোটরবাইক চালিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন একজন পরিচিত মানুষ। তিনিও এক প্রবাদপ্রতিম শিল্পী। গীতিকার’কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি থেমেছেন।  সব শুনে তিনি গীতিকার’কে বললেন একটুও সময় নষ্ট না করে তার বাইকের পেছনে উঠে পড়তে। তিনিও গড়িয়াহাটের দিকেই যাচ্ছেন। এই প্রস্তাবে গীতিকার অবশ্য একটুও খুশি হতে পারলেন না। তিনি কখনওই বাইকে চাপেন না। সায়গল আর পঙ্কজ মল্লিকের সেই বিখ্যাত ‘বাইক কাহিনি’ তিনি বিলক্ষণ জানেন। এই গল্প তিনি শুনেছেন পঙ্কজ কুমার মল্লিকের ছায়াসঙ্গী বিমল ভূষন বাবু’র মুখে। এদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে সেই বাইক আরোহী তাড়া দেন। শেষমেষ গীতিকার কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলে ওঠেন: ‘দাদা, আমার বাইকে চাপতে ভীষন ভয় করে। আমি যদি পড়ে যাই। তারচেয়ে বরং আপনি চলে যান, আমি হেঁটে চলে যাবো দরকার হলে। কিন্তু আমি বাইকে উঠবো না।’ যে কথা শুনেই ওই বাইক চালানো ব্যক্তি দিলেন এক বিরাট ধমক: ‘আইজকাল মাইয়ারা বাইকে চড়ে আর তুমি পুরুষ হইয়া পারবানা! হেইডা কইতে তুমার লজ্জা লাগে না?’

তারপর? শুনুন…

লেখা: অনুরাগ মিত্র
পাঠ: শঙ্খ বিশ্বাস
আবহ: শঙ্খ বিশ্বাস

পোল